ফেসবুকের পাতা উল্টানোর সময় প্রথম আলোর একটি শিরোনাম চোখে পড়লো – “হালদায় ডলফিন শিকার-হত্যা নয়, ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ”। বিষয়টি কয়েকদিন ধরেই সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ঘোরাঘুরি করছিল। আপনারা তা ভালোই জানেন। কিন্তু এবিষয়ক শুনানি দেওয়া হয়েছে ভার্চ্যুয়াল জগতে। এটিই দেশের ইতিহাসে উচ্চ আদালতে ভার্চ্যুয়াল উপস্থিতিতে দেওয়া প্রথম আদেশ। যেখানে ই-মেইলের মাধ্যমে রিট দাখিল করা হয়। বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, দেশে ই-জুডিশিয়ারি প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে এই ভার্চ্যুয়াল আদালত।
ভার্চ্যুয়াল জগতের ব্যবহার দিন দিন বেড়ে যাবে তা বেশ আগে থেকেই জানতেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। করোনা ভাইরাসের এই ক্রান্তিকালে ভার্চ্যুয়াল জগতের ব্যবহার বহুগুণে বেড়ে গেছে। হওয়াটাও অস্বাভাবিক না। প্রথমত, সাধারণ যোগাযোগ করার জন্য অনলাইন কলিং, ভিডিও কলিং, ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের দ্বারস্থ হচ্ছেন নানা পেশার মানুষ। গল্পগুজব করার জন্য এর চেয়ে ভালো মাধ্যম আর কি হতে পারে! তাছাড়া ডাক্তারদের সাথে ভিডিও যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর সাহায্য নিয়ে সেবা নেওয়ার হার বহুগুণে বেড়ে গেছে। তাছাড়া যে উপায়ও নেই। হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোতে গেলে ডাক্তার সময়মত পাওয়া কঠিন, উপরন্তু করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণে বেড়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে নিতে অনলাইন মাধ্যমের ব্যবহার। এই ক্রান্তিকাল ঠিক কবে সমাপ্ত হবে তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তার জন্য যদি সবকিছু ফেলে রাখা হয় তাহলে দেখা যাবে, সুদিন আসার পর হায়হুতাশ করতে হচ্ছে। এজন্য প্রযুক্তির সাহায্য নিতেই হচ্ছে। তাছাড়া আমলাতান্ত্রিক, প্রশাসনিক কাজে ভিডিও যোগাযোগ, কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে কাজ চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন আশির্বাদস্বরূপ, উল্টো দিকে সতর্ক না থাকলে অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার বিস্তর সম্ভাবনা থাকে। যেহেতু বাস্তবে কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে না, তাই সে অবস্থায় অসাধু ব্যক্তিদের অসাধুতা ফলাচ্ছে না। তখন ঐ অসাধু ব্যক্তিদের লক্ষ্য থাকে সেই ভার্চ্যুয়াল মাধ্যম।
করোনার দিনগুলিতে ‘জুম’ এর ব্যবহার বহুগুণে বেড়ে গেছে। জুম হল আমেরিকাভিত্তিক ‘জুম ভিডিও কমিউনিকেশনস’ ইনকরপোরেশনের একটি ভিডিও কলিং ও অনলাইন চেটিং সেবা। যা ক্লাউডভিত্তিক পেয়ার-টু-পেয়ার সফটওয়্যারের মাধ্যমে কাজ করে। এর মাধ্যমে ভিডিও কনফারেন্সিং, দূরপাঠ কার্যক্রম এবং সাধারণ যোগাযোগ করা হয়ে থাকে। বিনামূল্যে এবং সহজে ব্যবহার করা যায়, এজন্যই হয়তো ঘরবন্দি অবস্থা কাটিয়ে উঠতে মাধ্যমটির ব্যবহার হুরহুর করে বেড়ে গেছে। এপ্রিল মাসের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত তিন মাসে এর ব্যবহার ১০ মিলিয়ন থেকে ২০০ মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। যদিও এই বাড়তি ব্যবহারকারীদের চাপ সামাল দেওয়ার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠানটির ছিল না। কারণ এর পরিসর ছিল ছোট। ফলস্বরূপ মাধ্যমটিতে দেখা দিয়েছে নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা জনিত ঘাটতি। হ্যাকার এবং অসাধু ব্যক্তিদের নজর বেশ ভালো করেই পড়েছে এদিকে।
নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার দিক চিন্তা করেই গত এপ্রিলে গুগল কর্মীদের প্রাতিষ্ঠানিক কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রে জুম ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা আনে। অর্থাৎ কম্পিউটার জুমের সফটওয়্যার ইনস্টল করে ব্যবহার করা যাবে না। তবে ব্যক্তিগত মুঠোফোন বা ব্রাউজার থেকে সফটওয়্যারটির ব্যবহারের উপর কোনো নিষেধাজ্ঞা থাকবে না।
প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহারের সময় হ্যাকারদের যৌন নিপীড়নমূলক ভিডিও প্রচারের ঘটনাও ঘটে। গত সপ্তাহে যুক্তরাজ্যে এক স্পোর্টস ক্লাবের জুম অ্যাপ ব্যবহারের সময় এই ঘটনা ঘটে। যেখানে শিশুদের ফিটনেস বিষয়ক পাঠ চলছিল। যদিও সেখানকার স্থানীয় পুলিশ প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে জুমের মাধ্যমে সরাসরি পাঠদানের বিস্তারিত তথ্য আগেই জেনে গেছে হ্যাকাররা। এর অর্থ দাঁড়ায়, ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের অবহেলার জন্যই এমনটা হয়েছে।
বাংলাদেশে যেমন ভার্চ্যুয়াল আদালতের সূচনা হয়েছে, একইভাবে নানা প্রয়োজনে সারাবিশ্ব জুড়েই প্রযুক্তির ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিবে এবং তা বাড়তেই থাকবে। এসব ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক পদক্ষেপ না নিলে কখনো ফলপ্রসূ কিছু আশা করা বোকামি। জুমের মত প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের যেমন নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে, একইভাবে শিশুদের ফিটনেস অনলাইন ক্লাসের যে বিস্তারিত তথ্য গোপনীয়তার কথা চিন্তা না করেই দেওয়া হয়েছে, সেরকম অবহেলা করা যাবে না। অন্যদিকে সচেতন জায়গা থেকে প্রয়োজনমাফিক ক্ষেত্র বিশেষে গুগলের মত নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যেতে পারে।
শুধু একটি বিষয় চিন্তা করুন – আপনার সন্তান পিছিয়ে যাবে এইভেবেই হয়তো অনেক চিন্তাশীল নাগরিক বা অভিভাবক অনলাইন ক্লাস বা নানা সফটওয়্যারের ব্যবহার করছেন। কিন্তু একটি শিশু মনে যৌন উদ্দীপক বা নিপীড়নমূলক ভিডিও কী প্রভাব ফেলতে পারে!
(সূত্রঃ প্রথম আলো; দ্য ভার্জ; বিডিনিউজ২৪;)
লিখেছেন - মারিফুল হাসান।
No comments:
Post a Comment