Friday, May 15, 2020

বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ রিপোর্টিংয়ের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

রাজনৈতিক রিপোর্টিংয়ের খুব কাছাকাছি হচ্ছে সংসদীয় বা পার্লামেন্টারি রিপোর্টিং। বিশেষ করে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় সংসদ হচ্ছে রাজনীতির প্রধান আখড়া। সংবাদ উপাদান হিসেবে রাজনীতি সবসময় সব সংবাদের উপরে অবস্থান করে গুরুত্বের ভিত্তিতে। বিশেষ করে আমাদের দেশে সংসদীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা থাকার কারণে সংসদীয় রিপোর্ট ও রাজনৈতিক রিপোর্টিং একে অন্যের পরিপূরক। যদিও সংসদীয় রিপোর্টিং হলো পুরোপুরি টেকনিক্যাল রিপোর্টিং। সংসদীয় রিপোর্টিং করার জন্য তাই রিপোর্টারকে বিশেষজ্ঞের জ্ঞান ও পেশাগত নৈপুণ্য অর্জন করতে হয়। কারণ রুটিনমাফিক দৈনন্দিন ঘটনা, দূর্ঘটনা ও বক্তৃতা বিবৃতি কভার করতে দেওয়া নবিশ ও আনকোরা সাংবাদিকের পক্ষ্যে হঠাৎ করেই সংসদীয় রিপোর্ট কভার করা সম্ভব নয়। সংসদীয় রিপোর্ট করার আগে তাই একজন নবিশ সাংবাদিককে দীর্ঘদিন সংসদীয় কার্যপ্রণালীর সাথে পরিচিত হতে হয়। সংসদীয় ভাষা আয়ত্ত্ব করতে হয়। সংসদীয় পদ্ধতির রিপোর্টিংয়ের কাঠামোর সঙ্গে পরিচিত হতে হয়। তারপর দীর্ঘদিন অনুশীলনের পর কেবল একজন বিশেষজ্ঞ সংসদীয় রিপোর্টারের যোগ্যতা অর্জন করা যায়।   


গুরুত্ব
• আইনসভা একটি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা। এটি নাগরিকদের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে। 
• শাসন বিভাগের সিদ্ধান্ত ও কাজের পর্যালোচনা করে ও নীতি নির্ধারণ করে পুরনো সমস্যার সমাধান করে এবং তা করতে গিয়ে মানুষের মধ্যে নতুন চাহিদা ও সামাজিক তাগিদের তৈরি করে।
• সমাজের গতিময়তা ও সামাজিক মূল্যবোধ পার্লামেন্ট কার্যাবলির প্রধান নিয়ন্ত্রা।
• একটি পার্লামেন্ট তার দায়িত্ব যথাযথ পালন করছে কিনা তা নির্ভর করে বিভিন্ন সামাজিক প্রয়োজনে তা কতটা সাড়া দিচ্ছে তার উপরে। 
• সংবাদপত্রগুলো সার্বভৌম সংসদের পরিপূরক। কারণ সংবাদপত্রের মাধ্যমে তারা তাদের বক্তব্য উপস্থাপনের প্রয়াস পান।
• সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্র পরিচালনার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য জানা যায় সংসদীয় রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে।


তাৎপর্য
সংসদ হচ্ছে মূলত একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে আইন প্রণয়ন ও সংশোধন করা হয়। Parliament শব্দটি এসেছে ফরাসী Parlement থেকে। তখন Parlement বলতে আলোচনা, বিতর্ক ও পরামর্শক সভা ও সম্মেলন বুঝাতো। পরবর্তীকালে এর অর্থের পরিবর্তন ঘটে। এক সময় আনুষ্ঠানিক পরামর্শক সভা এবং তারপর আইনসভা বুঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হত।

আইনসভাকেই পার্লামেন্ট বলা হয়। ব্রিটিশ আইনসভা সর্বপ্রথম পার্লামেন্ট বলে চিহ্নিত হয়। ব্রিটিশ রাজা ও আইনসভা উভয় কক্ষকে একসাথে আনুষ্ঠানিকভাবে Parliament বলে ডাকা শুরু হয় ১২৩৬ সালে। প্রথমদিকে পার্লামেন্ট রাজার পরামর্শক সভা হিসেবে কাজ করতো। একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পার্লামেন্ট বিকাশ অনেক পর্যায় ও স্তর অতিক্রম করে আধুনিক অবস্থায় পৌঁছেছে। আধুনিককালে বিভিন্ন দেশে পার্লামেন্ট সংবিধান ও আইন আনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হয়। পার্লামেন্টের ধারণা ব্রিটিশ ঐতিহ্যভেদে প্রাপ্ত হলেও দেশভেদে পার্লামেন্টের নামকরণ, গঠন ও কার্যাবলীর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বিভিন্ন দেশের আইনসভাকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। যেমনঃ বাংলাদেশের আইনসভার নাম জাতীয় সংসদ। মার্কিন আইনসভার নাম কংগ্রেস। 

কোনো কোনো আইনসভা বা পার্লামেন্ট এক কক্ষ বিশিষ্ট আবার কোনো কোনোটি দ্বি কক্ষ বিশিষ্ট। দ্বি কক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার নিম্নকক্ষের সদস্যরা সরাসরি নির্বাচিত হন। উচ্চকক্ষের সদস্যরা কোনো কোনো দেশে নির্বাচিত, আবার কোনো কোনো দেশে মনোনীত হন। নিম্নকক্ষ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গঠিত হয় (সাধারণত ৫ বছর)। উচ্চকক্ষ সাধারণত একটি স্থায়ী পরিষদ হয়। এক কক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট নির্বাচিত হয় এবং নির্দিষ্ট সময় পর ভেঙ্গে যায়।
বাংলাদেশের আইনসভা এক কক্ষ বিশিষ্ট, সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা। এখানে আইন প্রণয়ন ছাড়াও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। আইন প্রণয়ন, নির্বাহী বিভাগ গঠন এবং রাষ্ট্রের মৌল নীতিমালা গ্রহণ করে পার্লামেন্ট। 

বাংলাদেশের সরকার পদ্ধতিতে নির্বাহী কর্তৃপক্ষ পার্লামেন্টের কাছে দায়ী থাকে। বলা হয়, পার্লামেন্ট সরকার ব্যবস্থা এমন একটি গণতান্ত্রিক পদ্ধতি যেখানে নির্বাহী কর্তৃত্বের উৎস যেমন আইনসভা তেমনি নির্বাহী বিভাগকে আইনসভার কাছে দায়িত্বশীল থাকতে হয়। বাংলাদেশে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তিনটি বিভাগে কাজ করা হয়ে থাকে। আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ।

শাসন বিভাগ - সরকারের শাসন বিভাগে রাষ্ট্রের শাসনকাজ পরিচালনা করা হয় আইনানুযায়ী। ব্যাপক অর্থে রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে গ্রাম্য পুলিশ পর্যন্ত সকলেই শাসন বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। সীমিত অর্থে শাসন বিভাগ বলতে রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে বুঝায়। রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধানের কার্যালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়ে শাসন বিভাগ গড়ে ওঠে। এদের মধ্যে মন্ত্রীবর্গ, প্রশাসনিক বাহিনী এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীবৃন্দ অন্তর্ভূক্ত। সহজ কথায়, রাষ্ট্রপ্রধান, সরকার প্রধান, মন্ত্রীপরিষদ এবং সচিবালয়ের সকলকে নিয়ে শাসন বিভাগ গঠিত হয়।

আইন বিভাগ - সরকারের যে বিভাগ আইন প্রণয়ন, পুরাতন আইন সংশোধন ও পরিবর্তন করে তাকে আইন বিভাগ বলে। বাংলাদেশের আইনসভা এক কক্ষ বিশিষ্ট। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি নিয়ে পাঁচ বছরের মেয়াদে আইন বিভাগ গঠিত হয়। 

বিচার বিভাগ - সরকারের যে বিভাগে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আইন অনুযায়ী বিচার কাজ পরিচালনা করে তাকে বলা হয় বিচার বিভাগ। বাংলাদেশে বিভিন্ন বিচারালয়ে বিচারক এবং কর্মচারীদের নিয়ে এই বিভাগ গঠন করা হয়। সুপ্রীম কোর্ট হলো বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ স্তর। এর প্রধানকে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি বলা হয়।

সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপরিচালনার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানা যায়। আর প্রেসিডেন্ট যদি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ উৎস হল তাহলে আইন পরিষদ হবে এমন একটি উৎস যেখানে রিপোর্টার সরকারের নির্বাহী শাখা থেকে পাওয়া তথ্যাবলি যাচাই করে নিতে পারেন। প্রকৃতিগত কারণেই আইন পরিষদ খুবই প্রকাশ উন্মুখ। অপরদিকে সরকারের নির্বাহী বিভাগ হচ্ছে রুদ্ধ প্রকৃতির। নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তারা প্রায়ই রিপোর্টারদের বলে থাকেন, আমি আপনাকে এই কথাটি বলছি কিন্তু আপনার রিপোর্টে আমার নাম সনাম উদ্ধৃতি দিবেন না। অপরদিকে রাজনৈতিক ব্যক্তিগণের প্রকৃতিই হচ্ছে নিজেকে আরও বেশি প্রকাশ করা। ফলে জনপ্রতিনিধি হয়ে আসা এ রাজনৈতিক ব্যক্তিগণ সবসময়ই সংবাদপত্র তথা ইতিহাসের পাতায় নিজেদের ঠাই করে নিতে চান। ফলে সংসদের ভিতরে হোক আর সংসদের বাইরে হোক তাদের ভূমিকা প্রচার পাক এটা তারা কামনা করেন। কোনো সংসদীয় রিপোর্টার তার সংসদীয় বিটকে তাদের নিয়ম মাফিক দায়িত্বের চেয়ে আরও বড় করে তুলতে চাইলে সংসদ সদস্য বহিঃর্ভুত মন্তব্যকে তারা আরো বেশি গভীর মনোযোগ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করেন। রুটিনমাফিক যে দায়িত্ব রিপোর্টারেরা পালন করেন তার অধিকাংশই থাকে বক্তব্যধর্মী বা সংসদীয় কমিটির বৈঠক সংক্রান্ত। এগুলো সবই খোলামেলা এবং এসব বিষয়ে রিপোর্ট তৈরি, রিপোর্টের বিষয়বস্তু নির্ধারণ সবই পরিচর্যার সঙ্গে করতে হবে। এটা করতে ভালো কল্পনাশক্তি প্রয়োজন।



একটি গণবাধ্যমের জন্য জাতীয় সংসদ অধিবেশন নিয়মিত কভার করা জরুরী কেনঃ
• রাষ্ট্র পরিচালনার যাবতীয় সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানা যায়
• জনগণ ও সরকারের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে সংসদ
• নির্বাহী বিভাগের দায়িত্বশীল থাকতে হয় আইনসভার কাছে। এখানে তাই যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য/জবাবদিহিতা পাওয়া যায়
• প্রশ্নোত্তর পর্ব কভার করতে গিয়ে জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার হিসাব পাওয়া যায়।
• প্রতিদিনই নিত্যনতুন সিদ্ধান্ত হচ্ছে, সেসব সিদ্ধান্ত জানানো সাংবাদিকের দায়িত্ব।
• প্রকৃতগতভাবে আইন পরিষদ খুবই প্রকাশ উন্মুখ, তাই সহজ সংবাদ উৎস। 





(লিখেছেন - অরুণমীলা)  


No comments:

Post a Comment

Featured Post

ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের প্রয়োজনীয়তা

- সমাজে প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণমাধ্যমের কাজ হলো সমাজের অপরাপর শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, বিশেষত রাষ্ট্র ও সরকারের কাজের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখা এবং জন...