(১) সংবাদের গূঢ় অর্থ প্রকাশ পাওয়া। ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটি ঘটনার গভীরে প্রবেশ করে। কেবল ঘটনার ভেতরে প্রবেশ করাই নয়, বরং ভেতরের সংবাদ বের করে আনা এর বৈশিষ্ট্য। ঘটনার পেছনের ঘটনাগুলোকে প্রতিবেদনে নিয়ে আসা। যেমনঃ ঢাকায় ছাত্রদের সাথে বাস শ্রমিক ও পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। পরপর দু’টো বাস বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট স্টপে না থামায় হাঙ্গামা শুরু হয়। এখন বাস ধর্মঘট চলছে। এটি হলো মোটামুটি সারফেস নিউজ। ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের বৈশিষ্ট্য হলো এই সারফেস নিউজের গভীরে গিয়ে তা আরো তথ্য বের করে আনবে। যেমন – যে বাসটি স্টপে থামেনি সেটি কি আসলেই নির্ধারিত জায়গায় থামেনি? এটা কি এজন্য যে নির্ধারিত জায়গায় থামলে বহুসংখ্যক ছাত্র জোর করে উঠে পড়ত? দ্বিতীয় বাসটি যেটাকে লক্ষ্য করে ছাত্ররা ইটপাটকেল ছুঁড়েছে সেটাও কি একই কারণে থামতে চায়নি? তা যদি ঠিক হয় তাহলে ধরে নেয়া যায় ছাত্রদের কলেজ থেকে শহরে আসার ব্যাপারে যানবাহনের সমস্যা আছে ও সমস্যাই সম্ভবত গোলযোগের মূল কারণ।
(২) ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন একটি বিশেষ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকগুলো ঘটনার স্রোতকে সম্পর্কায়িত করে। এ প্রক্রিয়ায় ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন সাধারণ সংবাদকে পাঠকের কাছে বোধগম্য করে তোলে। যেমনঃ উপরের ঘটনাটিতেই অনেকগুলো ঘটনার স্রোতকে সম্পর্কায়িত করছে। সাথে আরো নতুন কিছু প্রশ্নও করছে। যেমন – বাসশ্রমিকরা ছাত্রদের সাথে মারামারি করছে। এজন্যই কী ছাত্ররা সেদিন ঢিল ছুঁড়েছিল বলেই বাস-শ্রমিকরা খেপে গিয়েছিল নাকি ছাত্ররা তাদের সাথে প্রায়ই দুর্ব্যবহার করে বলে তাদের ধৈর্য্যচ্যুত ঘটেছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর ঘটনার সাথে অনেকগুলো ঘটনাকে একসূত্রে বেঁধে উত্তর দেয়ার চেষ্টা করে।
(৩) ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন ঘটনার রঙ অর্থাৎ এর পারিপার্শ্বিক অবস্থা, কি অবস্থায় ঘটনাটি ঘটেছিল তা বর্ণনা করে। এর সাথে যারা যুক্ত তাদের সম্পর্কে তথ্য দিয়ে ঘটনাটিকে অর্থবহ করে। যেমনঃ ঘটনাটিতে যে সংঘর্ষ হয়েছে তাতে যে বাসটির ক্ষতি হয়েছে তার মালিক হয়তো কোনো প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি, যার হয়ে কিছু লোকজন মারামারি বাঁধিয়েছিল। তাদের চরিত্র, পরিচয় দিয়ে প্রতিবেদন লেখা ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
(৪) ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন ঘটনার সাথে ঘটনা, তথ্যের উপর তথ্য সাজিয়ে সামগ্রিকভাবে ঘটনাটি তাৎপর্যময় করে তোলে।
(৫) ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন কেবল একটি দিককে তুলে ধরে না, বিভিন্ন মতের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় করিয়ে দেয়। সরল বা সাদামাটা রিপোর্ট কোনো ঘটনা বা বক্তব্যের কেবল একটি দিক তুলে ধরে। কিন্তু ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন ঐ বক্তব্যের বিপরীতে অন্য যে কথা আছে তাকেও সমপরিমাণ গুরুত্ব প্রদান করে। যেমনঃ বাস শ্রমিক-ছাত্র সংঘর্ষের ঘটনায় ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনে দু’পক্ষেরই মতামত সমান গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি এ বিষয়ে (বারবার সংঘর্ষের কারণ, ছাত্রদের সহিংস আচরণের কারণ, বিক্ষোভের সুদূরপ্রসারী ফলাফল) বিশেষজ্ঞ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতামতও গুরুত্বের সাথে প্রকাশ করতে হয়।
(৬) ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনে ঘটনার পরম্পরায় বা পরিস্থিতির দাবীতে রিপোর্টার তার প্রতিবেদনে মন্তব্য করতে পারেন। এখন প্রশ্ন হতে পারে, মন্তব্যই যদি করতে হয় তবে সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা কোথায় থাকলো? এ বিষয়ে বলা যায়, রিপোর্টার তার সংবাদ সূত্রের মধ্য দিয়ে মন্তব্যগুলোকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেন। বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রেখেও রিপোর্টার ঘটনার পটভূমিকে সামনে রেখে তার প্রজ্ঞা ও মেধা দিয়ে ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা করতে পারেন, তবে সেটি রিপোর্টিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হতে পারে।
(৭) ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনে কেবল তথ্য/পরিসংখ্যানই প্রয়োজন এ ধারণাটি ভুল। অনেক সময় তথ্যকে জীবন্ত করে তুলতে পারে ঘটনা। যেমনঃ বিজয় সিং দশ বছর যাবত বিনাদোষে ভারতের কারাগারে বন্দী থাকার পর নিজ দেশে স্থানান্তরের পরও জেলখানায় দিন কাটাতে হচ্ছে। এই বিষয়টি বিচার প্রক্রিয়া ও এই প্রক্রিয়ার ফাঁকগুলোকে সহজেই বুঝিয়ে দেয়। এ বিষয়ে যেকোনো ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন এই ঘটনাকে ব্যবহার করলে পাঠক আরও বেশী তাৎপর্য বুঝতে পারবেন। এই তথ্য ভান্ডার থেকে সংগ্রহ করার সময় বা নিজস্ব তথ্য ভাণ্ডার গড়ে তোলার সময় তথ্য/পরিসংখ্যান সংগ্রহই যথেষ্ট নয়, ঘটনাবলীর নোট রাখাও প্রয়োজন।
(৮) ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন কোনো সুনির্দিষ্ট ঘটনার প্রেক্ষিতে রচিত হতে পারে আবার বিশেষ কোনো সাময়িক ঘটনা ছাড়াও রচিত হতে পারে। বিশেষ কোনো ইস্যুকে উপস্থাপন করার জন্য কখনো কখনো সংবাদপত্র ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সংবাদপত্রের লক্ষ্য হয় কোনো বিশেষ ইস্যুতে জনমত সংগঠন।
আরও পড়ুন -
No comments:
Post a Comment