Wednesday, May 27, 2020

ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের প্রয়োজনীয়তা

- সমাজে প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণমাধ্যমের কাজ হলো সমাজের অপরাপর শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, বিশেষত রাষ্ট্র ও সরকারের কাজের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখা এবং জনগণের স্বার্থের অনুকূলে পরিচালনার জন্য পরামর্শ প্রদান করা। ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন একদিকে যেমন পাঠককে চলমান ঘটনাবলির ব্যাখ্যা প্রদান করে, অন্যদিকে সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন নীতি ও ঘটনার প্রতিক্রিয়া অবহিত করে এবং তার পরিণতি সম্পর্কে সজাগ করে তোলে।

- ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন সাধারণ মানুষ ও নীতি নির্ধারকদের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। নীতিনির্ধারকদের পক্ষে প্রতিটি বিষয়ে জনমত যাচাই করা সম্ভব হয় না। যদিও বিভিন্ন দিক বিবেচনা করেই নীতিনির্ধারকরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন তথাপি সকল দিকই যথাযথভাবে বিবেচিত হবে এমন আশা করা ঠিক নয়। কখনো কখনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অন্যান্য উপাদান এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করে যে, অনেক জরুরী বিষয় নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। এই রকম পরিস্থিতিতে ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন গৃহীত সিদ্ধান্ত বা নীতির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক তুলে ধরে এবং সাধারণ মানুষের চাহিদা ব্যক্ত করে। এতে করে সাধারণ মানুষ ও নীতিনির্ধারক উভয়ই উপকৃত হয় এবং প্রয়োজনীয় ত্রুটি সংশোধন করার সুযোগ লাগ করে।

- প্রতিদিনের সংবাদপত্র ও অন্যান্য গণমাধ্যম সংবাদ পাঠকদের কাছে যা উপস্থিত করে তা হলো সংঘটিত ঘটনাবলি। বক্তৃতা, দুর্ঘটনা, বাজারদর, খেলাধুলা ইত্যাদি যে উদাহরণই আমরা দেই না কেন দেখতে পাবো যে, ঘটনার বর্ণনাই হচ্ছে মুখ্য। সংবাদের প্রচলিত সংজ্ঞাও আমাদেরকে সেই ধারণা দেয়। ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন কেবলমাত্র আমাদেরকে ঘটনার মধ্যে সীমিত না রেখে আমাদের মনোযোগ সম্প্রসারিত করে দেয় বিভিন্ন বিষয়ে। ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে একসাথে সাজিয়ে পাঠককে বোঝায় ঘটনাগুলোর উৎস কোথায় এবং তার ফলে কী দাঁড়াচ্ছে। অর্থাৎ সাধারণ ঘটনা থেকে ইস্যুতে রূপান্তরের জন্য এবং সেই ইস্যুর উপর গুরুত্বারোপের জন্য দরকার ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের।

- ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের অন্যতম একটি তাগিদ হলো সত্যকে বোঝা। সত্যকে অনেকেই আপতিক ও প্রয়োজনের সত্য বলে দু’ভাগে ভাগ করে থাকেন। আপতিক সত্য হলো যা সরাসরি দেখা যায়। ঘটনার বর্ণনার মধ্যেই আপতিক সত্য প্রকাশিত। কিন্তু ঘটনার মধ্যে পুরো সত্য প্রকাশিত হয় না। ঐ সত্যের পেছনে লুকোনো প্রয়োজনের সত্যকে তুলে ধরতে প্রয়োজন হয় ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের। ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন ঘটনার অন্তর্নিহিত ও অব্যক্ত অর্থকে প্রকাশ করে একটি পরিস্থিতির অপ্রকাশিত কিন্তু উপস্থিত অর্থকে উপস্থাপন করে।  



(লিখেছেন - অরুণমীলা)



আরও পড়ুন - 

ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের কাঠামো

ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন রচনার বিশেষ কোনো নির্দিষ্ট কাঠামো নেই। রিপোর্টার তার নিজস্ব ইচ্ছা ও সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী কাঠামো তৈরি করে নেন। তবে ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের তিনটি প্রধান উপাদান রয়েছে –

(১) সংবাদ নেপথ্য বা পটভূমি বা প্রেক্ষিত (Background)
(২) মানবিকীকরণ (Humanization)
(৩) ব্যাখ্যা (Interpretation)


পটভূমিঃ

ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের পটভূমি হবে এরকম যার মধ্য দিয়ে বর্তমানকে ভবিষ্যতের দিকে টেনে নেওয়া যায়। ঘটনাপ্রবাহের প্রক্রিয়ায় অতীতের কোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানকে মূল্যায়ন করে ভবিষ্যত উন্মোচন করাই এর বৈশিষ্ট্য। সংবাদের নেপথ্যকে তুলে ধরতে না পারলে বর্তমান পরিস্থিতিকে অনেক সময় বোঝা যায় না।

অধিকাংশ সাংবাদিকের কাছে পটভূমির অর্থ হলো উপরিতলের সংবাদের সঙ্গে তথ্য সংযোজন করা। মাঝে মাঝে এটি ইতিহাস যা প্রাচীন বা আধুনিক উভয়ই হতে পারে। আর তা পাঠককে একটি আবহ দেয়।

সাধারণত এখানে কোনো ঘটনার ঐতিহাসিক পটভূমি তুলে ধরা হয় যার মধ্যদিয়ে পাঠক বুঝতে পারে কেন এই ঘটনা ঘটেছে। যেখানে ঐতিহাসিক পটভূমি উপস্থাপনের সুযোগ নেই সেখানে লাইব্রেরী বা দলিল দস্তাবেজের স্তুপ থেকে প্রয়োজনীয় অংশগুলো খুঁজে বের করতে হয়। 

যেমনঃ সরকার থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বাড়িভাড়া থেকে বাড়ির মালিকরা যে আয় করেন তার উপর নিয়মিত আয়কর ধার্য করা হয়েছে। বাড়ির মালিকের অন্য কোনো আয় ও বাড়িভাড়ার যে আয় সে দুটি যোগ করে মোট অংকের উপর কর ধার্য করা হবে। এ প্রতিবেদনের পটভূমি লিখতে গেলে অনেক কিছুই নিয়ে আসা যেতে পারে। যেমনঃ সরকারের এরকম সিদ্ধান্ত কী এই প্রথমবার নেওয়া হয়েছে নাকি আগেও নেওয়া হয়েছিল? প্রতিবছর বাড়িভাড়া বাড়ানোর অনুপাত কত? বাড়িভাড়া বাড়ানোর সাথে সাথে অন্যান্য আনুষঙ্গিক জিনিসের দাম বাড়ছে কিনা? বাড়ির মালিকের ইতোমধ্যেই নানা রকমের কর বা খাজনা দিচ্ছেন। সেসবের পরিমাণ কতটুকু? পাশাপাশি কর বৃদ্ধির ঘটনা আগেও ঘটে থাকলে তা আগে কেন বাস্তবায়িত হয়নি? কবে কোন প্রেক্ষিতে কর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল সেসব জানানো যেমন জরুরী তেমনি দেশের বাড়ি ভাড়া দেয় এমন মালিকের সংখ্যা কত। বাড়ি ভাড়া দেয়ার বিষয়টি গত কয়েক বছরে কি পরিমাণ বেড়েছে সেই সব তথ্য পটভূমিতে আনতে হবে।


মানবিকীকরণঃ

ব্যাখ্যামূলক রিপোর্টিংয়ের মানবিকীকরণ হচ্ছে এমন একটি শব্দ যার অর্থ হলো সংবাদগল্পকে পাঠকের পরিবেশের মধ্যে নিয়ে আসা। এর অর্থ এই নয় যে, সংবাদ গল্পটি পাঠককে উদ্দেশ্য করে লেখা। বরং তা সংবাদ গল্পটিকে এমনভাবে তৈরি করা যা পাঠকের কাছে কিছু একটা অর্থ তৈরি করে। বিষয়টির সাথে পাঠকের নৈকট্যের সম্পর্ক স্থাপন করে। যেমনঃ বাড়িভাড়ার মোট আয়ের উপর কর বসানোর ব্যাপারটিতে কারা বিপদে পড়ছেন তারা এই সংবাদটিতে আগ্রহী হয়ে উঠবেন। সেই সাথে ভাড়াটেরাও বিষয়টি সম্পর্কে আরো জানতে চাইবেন। কারণ, বাড়ির মালিকপক্ষ কর দিলে অবশ্যই বাড়িভাড়া বাড়ানোর একটি সম্পর্ক থাকে।

         
ব্যাখ্যাঃ

ব্যাখ্যা হলো একটি বিষয়ে সর্বোৎকৃষ্ট সংজ্ঞাদান। ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের ব্যাখ্যা অবশ্য কয়েকটি বিষয়ের উপস্থাপন। যেমন – পাঠকের মতামত, বিশেষজ্ঞদের মতামত, ঘটনার আরো বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যতের পূর্বাভাসের সমন্বয়ে কোনো ঘটনার ব্যাখ্যা দান।
ঘটনার গুরুত্ব কতটুকু, ঘটনার প্রকৃতি, কীভাবে ঘটনাটি ঘটলো তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়া হয় এই অংশে। যেমনঃ বাড়ি ভাড়ার উপর কর আরোপের ঘটনায় হার্ড নিউজ ও পটভূমি উল্লেখের পর ঘটনার প্রকৃতি বোঝাতে বাড়ির মালিকের, আয়কর বিভাগের কোনো কর্মকর্তার ও ভাড়াটিয়ার মতামত উপস্থাপন করা যেতে পারে।

পাশাপাশি দূরদর্শীতার পরিচয় এখানে মিলবে। যেমন – বাড়িভাড়া সংক্রান্ত নীতির একটি বিশেষ দিক হলো বাড়ির মালিকের যদি কোনো আয় থাকে তাহলে ভাড়ার সাথে সেই আয় যোগ করে তার উপর আয়কর ধার্য করা। যেহেতু বেশী আয়ের উপর করের আনুপাতিক হার বেশী। তাই অনেক বাড়িওয়ালা ভয় পাচ্ছেন প্রাপ্ত পুরো ভাড়াটিই কর হিসেবে চলে যাবে।

এখানে বিশেষজ্ঞদের মতামত দেয়া যেতে পারে। যেমন – একজন আয়কর আইন বিশেষজ্ঞ এ বিষয়ে বলেন, সরকারী নীতিটি ভুল, কারণ –

(১) একটি আয়ের উৎসের উপর একাধিক কর আরোপ করা হচ্ছে।
(২) অনেকে নিজে থাকার জন্য একটি সাধারণ বাড়ি তৈরি করে তার অংশবিশেষ ভাড়া দিয়ে বাড়ি তৈরির খরচ শোধ করছিলেন। তাদের এবং সত্যিকার ধনীদের মধ্যে নীতিগত পার্থক্য করা হচ্ছেনা। 
(৩) বছর বছর সম্পত্তি কর ধার্‍্য করা হলে অনেকে বাড়ি রাখতে পারবেন না। সেক্ষেত্রে বাড়ির মালিক হতে পারবে যেকোনো কোম্পানি, কারণ তারা বাসাভাড়াটাকে কোম্পানির সম্পদ হিসেবে দেখিয়ে সম্পত্তি কর থেকে অব্যাহতি পাবেন।

আবার এখানে ভবিষ্যতের পূর্বাভাসও দেয়া যেতে পারে। যেমন – এ অবস্থায় বাসাভাড়া থেকে কর আদায়ের কী পথ করা যায় এ বিষয়ে আরও কিছু বাড়ি মালিক ও আয়কর কৌসুলিদের মতামত নিলে তারা অনেকেই বলেন যে,
(১) সবদিক হিসাব করে বাড়ির উপর একটিমাত্র কর ধার্য করুন
(২) বাড়ি থেকে আয়কে অন্য আয়ের সাথে সংযুক্ত না করে এ কর হিসাব করা হোক।


উপরোক্ত আলোচনা থেকে ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের একটি কাঠামো পাওয়া যায় – 

(১) রিপোর্টটি বিচার-বিবেচনা করে মতের ওপর নির্ভর করে প্রস্তুত
(২) প্রমাণভিত্তিক তথ্য দেয়া হয়েছে
(৩) ভাড়াটেদের অতীত তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা বলে ভবিষ্যত কি হতে পারে তার আভাস দেয়া হয়েছে
(৪) সরকার যেমন নীতির কথা বলেছে তেমনি কর ধার্য ও করদান নীতির অনুল্লিখিত দিকও তুলে ধরা হয়েছে
(৫) সমাধানের কথা বলা হয়েছে
(৬) সর্বোপরি যে পরিণতি আশঙ্কা করা হয়েছিল তা অবধারিত, তা স্পষ্ট বলা হয়েছে।

অর্থাৎ, ঘটনার পটভূমি, ঘটনার অপ্রকাশিত দিক, ভবিষ্যতের ইঙ্গিত, পাঠকের সাথে সম্পর্ক, পাঠকের কাছে অর্থপূর্ণ ও মনোগ্রাহী করে তোলার চেষ্টা সবকিছুই রাখা হয়েছে। আর এ গুলোকেই বলা হচ্ছে ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের কাঠামো।



(লিখেছেন - অরুণমীলা)



ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের বৈশিষ্ট্য

(১) সংবাদের গূঢ় অর্থ প্রকাশ পাওয়া। ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটি ঘটনার গভীরে প্রবেশ করে। কেবল ঘটনার ভেতরে প্রবেশ করাই নয়, বরং ভেতরের সংবাদ বের করে আনা এর বৈশিষ্ট্য। ঘটনার পেছনের ঘটনাগুলোকে প্রতিবেদনে নিয়ে আসা। যেমনঃ ঢাকায় ছাত্রদের সাথে বাস শ্রমিক ও পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। পরপর দু’টো বাস বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট স্টপে না থামায় হাঙ্গামা শুরু হয়। এখন বাস ধর্মঘট চলছে। এটি হলো মোটামুটি সারফেস নিউজ। ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের বৈশিষ্ট্য হলো এই সারফেস নিউজের গভীরে গিয়ে তা আরো তথ্য বের করে আনবে। যেমন – যে বাসটি স্টপে থামেনি সেটি কি আসলেই নির্ধারিত জায়গায় থামেনি? এটা কি এজন্য যে নির্ধারিত জায়গায় থামলে বহুসংখ্যক ছাত্র জোর করে উঠে পড়ত? দ্বিতীয় বাসটি যেটাকে লক্ষ্য করে ছাত্ররা ইটপাটকেল ছুঁড়েছে সেটাও কি একই কারণে থামতে চায়নি? তা যদি ঠিক হয় তাহলে ধরে নেয়া যায় ছাত্রদের কলেজ থেকে শহরে আসার ব্যাপারে যানবাহনের সমস্যা আছে ও সমস্যাই সম্ভবত গোলযোগের মূল কারণ।

(২) ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন একটি বিশেষ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকগুলো ঘটনার স্রোতকে সম্পর্কায়িত করে। এ প্রক্রিয়ায় ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন সাধারণ সংবাদকে পাঠকের কাছে বোধগম্য করে তোলে। যেমনঃ উপরের ঘটনাটিতেই অনেকগুলো ঘটনার স্রোতকে সম্পর্কায়িত করছে। সাথে আরো নতুন কিছু প্রশ্নও করছে। যেমন – বাসশ্রমিকরা ছাত্রদের সাথে মারামারি করছে। এজন্যই কী ছাত্ররা সেদিন ঢিল ছুঁড়েছিল বলেই বাস-শ্রমিকরা খেপে গিয়েছিল নাকি ছাত্ররা তাদের সাথে প্রায়ই দুর্ব্যবহার করে বলে তাদের ধৈর্য্যচ্যুত ঘটেছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর ঘটনার সাথে অনেকগুলো ঘটনাকে একসূত্রে বেঁধে উত্তর দেয়ার চেষ্টা করে।

(৩) ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন ঘটনার রঙ অর্থাৎ এর পারিপার্শ্বিক অবস্থা, কি অবস্থায় ঘটনাটি ঘটেছিল তা বর্ণনা করে। এর সাথে যারা যুক্ত তাদের সম্পর্কে তথ্য দিয়ে ঘটনাটিকে অর্থবহ করে। যেমনঃ ঘটনাটিতে যে সংঘর্ষ হয়েছে তাতে যে বাসটির ক্ষতি হয়েছে তার মালিক হয়তো কোনো প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি, যার হয়ে কিছু লোকজন মারামারি বাঁধিয়েছিল। তাদের চরিত্র, পরিচয় দিয়ে প্রতিবেদন লেখা ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

(৪) ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন ঘটনার সাথে ঘটনা, তথ্যের উপর তথ্য সাজিয়ে সামগ্রিকভাবে ঘটনাটি তাৎপর্যময় করে তোলে।

(৫) ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন কেবল একটি দিককে তুলে ধরে না, বিভিন্ন মতের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় করিয়ে দেয়। সরল বা সাদামাটা রিপোর্ট কোনো ঘটনা বা বক্তব্যের কেবল একটি দিক তুলে ধরে। কিন্তু ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন ঐ বক্তব্যের বিপরীতে অন্য যে কথা আছে তাকেও সমপরিমাণ গুরুত্ব প্রদান করে। যেমনঃ বাস শ্রমিক-ছাত্র সংঘর্ষের ঘটনায় ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনে দু’পক্ষেরই মতামত সমান গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি এ বিষয়ে (বারবার সংঘর্ষের কারণ, ছাত্রদের সহিংস আচরণের কারণ, বিক্ষোভের সুদূরপ্রসারী ফলাফল) বিশেষজ্ঞ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতামতও গুরুত্বের সাথে প্রকাশ করতে হয়।

(৬) ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনে ঘটনার পরম্পরায় বা পরিস্থিতির দাবীতে রিপোর্টার তার প্রতিবেদনে মন্তব্য করতে পারেন। এখন প্রশ্ন হতে পারে, মন্তব্যই যদি করতে হয় তবে সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা কোথায় থাকলো? এ বিষয়ে বলা যায়, রিপোর্টার তার সংবাদ সূত্রের মধ্য দিয়ে মন্তব্যগুলোকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেন। বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রেখেও রিপোর্টার ঘটনার পটভূমিকে সামনে রেখে তার প্রজ্ঞা ও মেধা দিয়ে ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা করতে পারেন, তবে সেটি রিপোর্টিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হতে পারে।

(৭) ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনে কেবল তথ্য/পরিসংখ্যানই প্রয়োজন এ ধারণাটি ভুল। অনেক সময় তথ্যকে জীবন্ত করে তুলতে পারে ঘটনা। যেমনঃ বিজয় সিং দশ বছর যাবত বিনাদোষে ভারতের কারাগারে বন্দী থাকার পর নিজ দেশে স্থানান্তরের পরও জেলখানায় দিন কাটাতে হচ্ছে। এই বিষয়টি বিচার প্রক্রিয়া ও এই প্রক্রিয়ার ফাঁকগুলোকে সহজেই বুঝিয়ে দেয়। এ বিষয়ে যেকোনো ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন এই ঘটনাকে ব্যবহার করলে পাঠক আরও বেশী তাৎপর্য বুঝতে পারবেন। এই তথ্য ভান্ডার থেকে সংগ্রহ করার সময় বা নিজস্ব তথ্য ভাণ্ডার গড়ে তোলার সময় তথ্য/পরিসংখ্যান সংগ্রহই যথেষ্ট নয়, ঘটনাবলীর নোট রাখাও প্রয়োজন।

(৮) ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন কোনো সুনির্দিষ্ট ঘটনার প্রেক্ষিতে রচিত হতে পারে আবার বিশেষ কোনো সাময়িক ঘটনা ছাড়াও রচিত হতে পারে। বিশেষ কোনো ইস্যুকে উপস্থাপন করার জন্য কখনো কখনো সংবাদপত্র ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সংবাদপত্রের লক্ষ্য হয় কোনো বিশেষ ইস্যুতে জনমত সংগঠন। 



(লিখেছেন - অরুণমীলা)



ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন কী?

ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের মূল লক্ষ্য হলো পাঠককে কোনো বিষয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ প্রদান করা। পাঠকরা প্রতিদিন যে অপরিমেয় তথ্য লাভ করেন তার মধ্য থেকে যেসব তথ্য মানুষের জন্য তাৎপর্যবহ তাকে বোধগম্য ও সহজবোধ্যভাবে উপস্থাপন করাই ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের কাজ। কোনো তথ্য কেন এবং কীভাবে পাঠকের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করছে বা কীভাবে তা পাঠকের জন্য গুরুত্ববহ হয়ে উঠবে তা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন।

মানুষের কৌতুহল দিন দিন বাড়ছে। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রেই বর্তমানের সংবাদপত্র পাঠক শুধুমাত্র প্রচলিত ও সাদামাটা সংবাদ পড়ে সন্তুষ্ট হতে পারেন না। তারা বিশ্লেষণ চান। সংবাদের গভীরে যেতে চান। তাই সংবাদের পেছনে যে সংবাদ থাকে (news behind the news) সেটাও পাঠক জানতে চান। এ কারনেই সাংবাদিকতা জগতে আবির্ভাব হয়েছে ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের।

সাংবাদিকতায় সাধারণত ২ ধরনের প্রতিবেদন দেখা যায়।


উপরিতলের প্রতিবেদনকে কেউ কেউ সাদামাটা সংবাদ (straight jacket) বলে। এগুলো হল দিনের সাধারণ সংবাদ যাতে কোনো ঘটনার উপরের দিকটাই প্রকাশিত হয়। এ ধরনের প্রতিবেদনে পাঠকের মনে ঘটনা সম্পর্কে আরও যে প্রশ্নগুলো জাগ্রত হয় তার উত্তর পাওয়া যায় না। এজন্য পাঠক গভীরতর প্রতিবেদন পাঠে আগ্রহী হন। গভীরতর প্রতিবেদনকে আবার ২ ভাগে আলোচনা করা যেতে পারে। 
ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন কী?

একটি ঘটনা ঘটার সময় কোনো রিপোর্টার নিজে যা দেখেছেন অথবা না দেখে থাকলেও বিশ্বস্ত সূত্র থেকে যে তথ্য পেয়েছেন সেসব তথ্য নিয়ে আপাতদৃষ্টিতে বস্তুনিষ্ঠ ও সত্যাশ্রয়ী একটি রিপোর্ট লিখতে পারেন। এভাবেই বেশিরভাগ রিপোর্ট করা হয়ে থাকে। এ ধরনের রিপোর্টকে বলা হয় সারফেস নিউজ বা উপরিতল সংবাদ।

ধরা যাক, ঝিনাইদহের একটি গ্রামে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে তার ছাত্রীকে হেনস্থা করার অভিযোগ উঠেছে। মেয়েটির বাবা-মা অভিযোগ করেছেন যে স্কুলে প্রধান শিক্ষক জরুরী এক কাজে তার ছাত্রীকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। সেখানে মেয়েটিকে নানারকম অশালীন ও অনৈতিক কথা বলে এবং পাশাপাশি মেয়েটির সাথে অসদাচরণ করেন। এবং পরবর্তীতে এ বিষয়ে সালিশ বসলে স্কুলের সেই প্রধান শিক্ষকের সাথে নবম শ্রেণীতে পড়া মেয়েটির বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়। উল্লেখ্য, সালিশে ইউনিয়ন পরিষদের হর্তাকর্তাসহ ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত ছিলেন।

এসব যা কিছু রিপোর্টটিতে দেয়া হয়েছে তা কেবল এক দিনের ঘটনা এবং যা ঘটেছে তা সরাসরি দেখা গেছে আর সে অনুযায়ী রিপোর্টটি সাজানো হয়েছে। এ ঘটনার কিছু অগ্রপশ্চাৎ থাকতে পারে যা পাঠকের জানা প্রয়োজন। তাই এই একই ঘটনা নিয়ে অন্যরকম একটি প্রতিবেদন করা যায়। যেমনঃ মেয়েটি প্রধান শিক্ষকের গিয়েছিলেন, ঠিক কি প্রয়োজনে গিয়েছিলেন? প্রধান শিক্ষক কী আগে কোনো অসদাচরণ করেছিলেন? প্রধান শিক্ষকের সাথে মেয়েটির যে বিয়ে দেয়া হলো, তার কি আগে কোনো বিয়ে ছিল? থাকলে প্রথম স্ত্রীর কাছ থেকে কী অনুমতি নেয়া হয়েছিল? আবার, অভিযোগ যার উপরে আনা হয়েছে মূলত সে অপরাধী। গ্রামের সালিশের মধ্যে চেয়ারম্যান, মেম্বার, ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। তাদের উপস্থিতিতে এবং সিদ্ধান্তে অপরাধীর সাথে মেয়েটির যে বিয়ে দেয়া হলো সেটি কি ঠিক হয়েছে? এখানে সংশ্লিষ্টরা কেন চুপ করে ছিলেন? প্রধান শিক্ষক বয়সী একজন মানুষের সাথে তের-চৌদ্দ বছর বয়সী একটি মেয়েকে বিয়ে দেয়া হলো সেটি কী নৈতিক? বা ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে আঠারো বছরের নিচে মেয়েকে বিয়ে দেয়া হয়েছে তা কী আইনের লঙ্ঘন হয়নি?

যেসব প্রশ্ন তোলা হলো সেগুলোর উত্তর যদি প্রথম রিপোর্টটির সাথে জুড়ে দেয়া যায়, তাছাড়া এরকম ঘটনায় এলাকার মানুষ কী ভাবছেন, একরম ঘটনা আগেও ঘটেছে কিনা, আইনের বিরোধী এই কাজটিকে বিশেষজ্ঞরা কীভাবে মূল্যায়ন করছেন অথবা আসলে বিয়ে দেয়া ছাড়া আর কী উপায়ে ঘটনাটি সামলে নেয়া যেতো ইত্যাদি বলা হলে সমস্ত ঘটনার একটি পূর্ণ চিত্র পাওয়া যেত, ঘটনার প্রেক্ষিত থাকত, আর সাদা চোখে যা ধরা পড়ছে না এমন সব কার্যকারণের যোগাযোগগুলোও প্রকাশ পেতো। ঝিনাইদহের মানুষ শুধু প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণের চেয়ে বেশী কিছু জানতো।

উপরের ঘটনা থেকে দেখা যাচ্ছে, ঐ ধরনের রিপোর্ট আপাতদৃষ্টিতে নয় এমন সব তথ্য বের করে আনে, একটি ঘটনাকে তার পূর্ণ প্রেক্ষিতে স্থাপন করে এবং সেই ঘটনার সাথে সম্পর্কযুক্ত তথ্য পরিবেশন করে পাঠকের জিজ্ঞাসা মেটায়। তার চেয়েও বড় কথা এই যে, খবরটির মর্ম উপলব্ধি করা যায় এধরনের রিপোর্ট থেকে। এধরনের রিপোর্টকে ইন-ডেপথ রিপোর্ট বলা হয়। এধরনের রিপোর্টের মধ্যে কিছু থাকে অনুসন্ধানী আবার কিছু থাকে ব্যাখ্যামূলক।

মার্কিন কলামিস্ট রস্কো ড্রামন্ড ব্যাখ্যামূলক রিপোর্টের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে – 
“Setting today’s event against yesterday’s background to give tomorrow’s meaning.” 
অর্থাৎ আজকের ঘটনাকে গতকালের প্রেক্ষিতে উপস্থাপন, যাতে আগামীকাল এই ঘটনার ফলাফল কী দাঁড়াবে তা বোঝা যায়। তবে বেশিরভাগ সাংবাদিক এই সূত্রটি বড় বেশী সরল ও কার্যত যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন। নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার রবিবাসরীয় সম্পাদক লেস্টার মার্কেল বলেছেন, ব্যাখ্যা করা এইজন্য যাতে একটি খবরের গূঢ় অর্থটি পরিস্ফুটিত হয়। এ হলো সংক্ষেপে পটভূমি, ঘটনাক্রম ও সর্বোপরি মর্মার্থ বা গুরুত্বসমূহের সমন্বয়। 

একজন সম্পাদক বলেছেন, মূল ঘটনা, তার পরিবেশ ও তার চতুর্দিকের পরিস্থিতি, ঘটনাস্থলের বর্ণ ও গন্ধ, ঘটনার সাথে জড়িত ব্যক্তির পরিচয়, চরিত্র ও উদ্দেশ্য, বৃহত্তর ঘটনাপ্রবাহে ঐ ঘটনার গুরুত্ব – এ সবকিছুর সমন্বয় ঘটবে যে রিপোর্টে সেটাই হবে সবচেয়ে ভালো ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন।

আরেকজন সাংবাদিকের ভাষায়, একটি রিপোর্টে কে, কী, কখন, কোথায়, কীভাবে, কেন – সব বলার পরেও পাঠকের একটি জিজ্ঞাসা থেকে যায়, যথা – সবকিছুর ফল কী হলো বা বিষয়টি কী দাঁড়ালো? তার মতে, পাঠকের প্রশ্নটির জবাব দিতে হবে সাংবাদিককে, আর সেজন্যই প্রয়োজন ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের। 

বিশিষ্ট সাংবাদিক আতাউস সামাদ বলেছেন, 
‘এই ধরনের রিপোর্টের আসল উদ্দেশ্য হলো একটি ঘটনার অন্তর্নিহিত ও অব্যক্ত অর্থ প্রকাশ করা, একটি পরিস্থিতির অপ্রকাশিত দিকগুলো তুলে ধরে সামগ্রিকভাবে একটি ছবি আঁকা। ভবিষ্যতের কোনো ইঙ্গিত থাকলে তা উল্লেখ করা। পাঠকের সাথে যদি এইসব ঘটনার কোনো সম্পর্ক থাকে তা তার কাছে তুলে ধরা এবং এইসব মিলিয়ে প্রতিবেদনটি তার কাছে অর্থপূর্ণ ও মনোগ্রাহী করে তোলা।’


(লিখেছেন - অরুণমীলা)


Saturday, May 23, 2020

সংবাদের বৈশিষ্ট্য

আভিধানিক অর্থে সংবাদ হলো কোনো সাম্প্রতিক ঘটনা বা প্রস্তাব সম্পর্কিত বিবরণ। মেলভিন মেনচার এর Basic News Writing বইয়ে লেখক সংবাদের সংজ্ঞাকে উপস্থাপন করেছেন এভাবে – 
News is a material that the public must have because it is important.
অর্থাৎ জনগণ যেসব বিষয় জানতে চায় তাই সংবাদ। The Complete Reporterহ্যারিস এবং জনসন বলেছেন, 
News is an account or event, or a fact or opinion which interests people.
অর্থাৎ সংবাদ হচ্ছে একটি ঘটনা, বিষয় বা মতামতের বিবরণী যা জনগণ আগ্রহ নিয়ে পড়বে। 


সংবাদের এরকম অনেক বৈশিষ্ট্য দেশীবিদেশী অনেক সাংবাদিক বা তাত্ত্বিক দিয়েছেন। সংবাদের প্রকৃতি বুঝতে হলে সংবাদের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যোগুলো জানা প্রয়োজন।

  • সংবাদ কোনো ঘটনা নয়, ঘটনার বিবরণ মাত্র।
  • সংবাদ সাধারণত কোনো সাম্প্রতিক ঘটনার প্রতিবেদন।
  • সংবাদকে অবশ্যই নির্ভুল হতে হয়।
  • সংবাদের প্রতিবেদনটিকে বস্তুনিষ্ঠ হতে হয়।
  • সংবাদ হতে হবে সত্যনিষ্ঠ বা সত্যনির্ভর। বলাই হয়ে থাকে, সংবাদ হলো বাস্তব তথ্য নির্ভর, কল্পনাপ্রসূত নয়।
  • সংবাদ হবে যথার্থ ও নির্ভুল। কেননা, সংবাদে যা বলা হয় সেটিকে সত্য হিসেবে জেনে মানুষ তাতে বিশ্বাস রাখে, আস্থা রাখে। 
  • সংবাদের প্রতিবেদনটি হতে হয় সুষম ও ভারসাম্যপূর্ণ। যেখানে যতটা গুরুত্ব দেয়া দরকার ততটাই দিতে হয়। এর কম বা বেশী নয়। 


যদি একটু নির্দিষ্ট করে বলা হয় – 

a. Truthful – সংবাদ বিশ্বাসযোগ্য ও সত্যনিষ্ঠ হতে হবে। মনগড়া বা কল্পনাপ্রসূত বিবরণী সংবাদ নয়।
b. Brevity – সংবাদে অতিরঞ্জিত তথ্য দেয়া যাবে না, বরং যথাযথ বর্ণনার উপস্থাপিত হতে হবে।
c. Clarity – অবশ্যই স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
d. Concise and Clear – সংবাদ হতে হবে সহজ, সরল, সাবলীল ও সংক্ষিপ্ত।
e. Current – সংবাদ পচনশীল। তাই সংবাদ হতে হয় সময়োচিত।
f. Balanced – পূর্ণাঙ্গ বিবরণী সন্নিবিষ্ট হতে হবে। যাতে পাঠক-শ্রোতা স্বচ্ছ-সুষম ধারণা পায়।
g. Life-related – জীবন ঘনিষ্ঠ হতে হবে। মানুষ চায় জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট ঘটনা আগে জানতে।
h. Significant – অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ হতে হবে। থাকবে আবেগ, বিস্ময়, চমৎকারিত্ব। 
i. Objective – সংবাদ হবে বস্তুনিষ্ঠ, বিকৃত করা যাবে না।
j. Accuracy – সংবাদ হতে হবে যথার্থ ও নির্ভুল।


যোগাযোগের সরঞ্জাম/হাতিয়ারসমূহ

C4D মূলত তার কার্যক্রম চালাতে বিভিন্ন পদ্ধতি ও বিস্তৃত চ্যানেল ব্যবহার করে। যোগাযোগের সরঞ্জাম কি হবে তা নির্ধারন করবে কোন নির্দিষ্ট দর্শক বা সাংস্কৃতিক পরিবেশ বা প্রেক্ষাপটে কাজ করা হচ্ছে তার উপরে। যেমনঃ গ্রামাঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেয়ার পদ্ধতি জানাতে এক রকমের যোগাযাগ সরঞ্জাম প্রয়োজন, আবার শহরে শিশুদের সহিংসতা প্রতিরোধে প্রচারাভিযানের জন্য অন্য রকমের যোগাযোগ সরঞ্জাম প্রয়োজন। 


যোগাযোগের সরঞ্জামকে আমরা তিনটি ধরনে ভাগ করতে পারি – 

(১) মানুষের মধ্যে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ
(২) মিডিয়ার মাধ্যমে যোগাযোগ
(৩) নয়া মাধ্যম / মাল্টিমিডিয়া যোগাযোগ
মোটা দাগে এই তিন ভাগে যোগাযোগের সরঞ্জামগুলোকে ভাগ করা যায় –
আরও পড়ুন - 

Friday, May 22, 2020

উন্নয়নের জন্য যোগাযোগের কৌশল (Approaches of C4D)

Source:  Adapted from the Centers for Disease Control and Prevention (CDC), The Social Ecological Model:  A Framework for Prevention, http://www.cdc.gov/violenceprevention/overview/social-ecologicalmodel.html (retrieved April 21, 2014).



Figure টিতে c4d এর কৌশলগুলোকে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি কৌশলের সাথে তাদের মূল বৈশিষ্ট্য এবং এই প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট অংশগ্রহণকারী দলের পরিচিতি দেয়া হয়েছে। c4d এর কৌশলগুলো একে অন্যের সাথে সম্পর্কিত। এই কৌশলগুলো পরিকল্পিতভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে একটি সফল ফলাফল পাওয়া সম্ভব। সাধারণ কিছু পদক্ষেপ ব্যক্তি বা আন্তঃব্যক্তিক পর্যায়ে নেয়ার মাধ্যমে আচরণে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা যায়। যেমনঃ শিশু সন্তান জন্মের পর মা ও শিশুর স্বাস্থ্য বিষয়ক চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন। অ্যাডভোকেসি পলিসি সেই পরিবর্তন আনার জন্য প্রচারণা চালিয়ে মানুষের সমর্থন আনতে পারে। সবগুলো কৌশল একসাথে প্রয়োগের মাধ্যমে কমিউনিটি ও প্রাতিষ্ঠনিক পরিবর্তন, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, চিন্তাভাবনার পরিবর্তন করা সম্ভব সময়ের সাথে সাথে। 

অ্যাডভোকেসি
Social Ecological Model এ অ্যাডভোকেসির সাথে পলিসি বা যেকোনো নতুন আইন বা নিয়ম প্রণয়নের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির একটি আন্তঃসাম্পর্কিক ক্ষেত্র তৈরি করে। অ্যাডভোকেসি মূলত কোনো কিছুর বিষয়ে প্রচারণা চালিয়ে যাওয়া। কোনো কিছুর পক্ষে জনসমর্থন তৈরি করতে সে বিষয়ে ওকালতি করা। কোনো প্রোগ্রামের উদ্দেশ্য সাধনে বা নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে মানুষকে তথ্য দিয়ে অথবা নেতৃত্বকে প্রণোদিত করে জাতীয়, রাষ্ট্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে পরিবর্তন আনতে একটি উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করাটাই হলো অ্যাডভোকেসি।

অ্যাডভোকেসির উদ্দেশ্য – 

(১) নতুন নীতিমালা তৈরির জন্য বা বর্তমান সরকারি বা সাংগঠনিক আইন বা নীতি নিয়ম পরিবর্তন অথবা বিদ্যমান নীতিগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
(২) সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামাজিক নিয়ম ও কাজের ধারা পুনঃনির্মিত করা।
(৩) বিদ্যমান আইন, নিয়ম ও পদ্ধতি দ্বারা জনমানুষের উপকার হলে তার সমর্থন করা।
(৪) কোনো নির্দিষ্ট উদ্যোগ গ্রহণে প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহে প্রভাবিত করা।


অ্যাডভোকেসির ধরনঃ

(১) পলিসি অ্যাডভোকেসিঃ কোনো আইনগত, সামাজিক বা কাঠামোগত পরিবর্তন আনার জন্য নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করা। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের আইন পরিবর্তনে প্রভাবিত করা। যেমনঃ স্বাস্থ্যনীতি, শিক্ষ্যানীতি। সাধারণত মতবিনিময় কোনো সভা বা সেমিনারে এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। 
(২) কমিউনিটি অ্যাডভোকেসিঃ সমাজের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে কিছু নীতিনির্ধারনা থাকে, সেগুলোতে পরিবর্তন আনা। কমিউনিটির লোকজনের সাথে সংলাপের মাধ্যমে কোনো ইস্যুতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা। 
(৩) মিডিয়া অ্যাডভোকেসিঃ কোন পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের পরিবর্তন আনতে প্রভাবিত করতে মিডিয়ার সাহায্য নেয়া। 

অ্যাডভোকেসি সাধারণত সমাজের বিভিন্ন নীতিনির্ধারকদের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিবর্তন আনতে নতুন পরিকল্পনা সংযোজন করতে জনমানুষের সামনে আলোচনাকে সমর্থন করে। এই প্রক্রিয়াটিতে প্রয়োজনীয় তথ্য, সমালোচনা, ন্যায্যতা প্রতিপাদনের জন্য যুক্তি তর্ক উপস্থাপনকে সমর্থন করে। অ্যাডভোকেসির কিছু উদাহরণ দেয়া যাক –

- C4d প্রোগ্রামের জন্য আর্থিক ক্ষেত্র তৈরি
- গবেষণার জন্য সহায়তা
- মিডিয়ার সহায়তা অর্জনে কাজ করা
- মানসম্মত পর্যবেক্ষন প্রক্রিয়া তৈরি
- স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য আরো উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি

প্রতিবন্ধকতা

(১) রাজনৈতিক অথবা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতায়নে অস্থিরতা
(২) প্রোগ্রামের সার্বিক খরচে ঘাটতি
(৩) প্রোগ্রাম সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব
(৪) সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে মতবিরোধ
(৫) উন্নয়নকর্মীদের বিভিন্ন স্তরে কম কাজের প্রবণতা
(৬) সিস্টেমের প্রয়োজনীয় উপাদানের ঘাটতি; যেমনঃ human resource, commodities
(৭) বিপরীত কোনো নীতি
(৮) নীতিনির্ধারকদের সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব
(৯) সাংস্কৃতিক চর্চা, মূল্যবোধ প্রভৃতিতে পরিবর্তন আনতে ব্যর্থতা


অ্যাডভোকেসি প্রণয়নে করনীয়

(১) অ্যাডভোকেসি কৌশল বাস্তবায়ন করার জন্য একটি কার্যকর দল গঠন।
(২) অ্যাডভোকেসি ইস্যুগুলো সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা। যেমনঃ কোন ইস্যুতে বিদ্যমান আইন ও নিয়মকানুন চর্চার ক্ষেত্র খুঁজে বের করা। কোনো ইস্যু নিয়ে কাজ করার আগে কেন ইস্যুটির উপরে কাজ করা জরুরি সে সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা থাকা উচিৎ।
(৩) প্রাথমিক এবং আনুষঙ্গিক অংশগ্রাহী দল চিহ্নিত করা। অর্থাৎ কারা নীতিনির্ধারক, কাদের জন্য নীতিনির্ধারিত হচ্ছে এই দলগুলোকে আলাদা করে ফেলা।
(৪) কাজের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যসূত্র খুঁজে বের করা।
(৫) অ্যাডভোকেসির উদ্দেশ্য খুঁজে বের করে তার জন্য প্রয়োজনীয় কী কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে তা খতিয়ে দেখা। 
(৬) অ্যাডভোকেসির কাজটি করার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল ও সংস্থান নিশ্চিত করা। 
(৭) অ্যাডভোকেসি প্রক্রিয়া সম্পাদনে প্রয়োজনীয় tools তৈরি করা ও খতিয়ে দেখা।



Social Mobilization / জনসমর্থন তৈরি

একটি ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যে নানা শ্রেণীর মানুষ থাকে। জনসমর্থন তৈরি এমন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া যা জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের এই নানা শ্রেণীর মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করে। কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধনে সচেতনতা তৈরি করে এবং আন্তঃক্ষেত্রীয় অংশীদারদের (inter-sectoral partners) এই সচেতনতা তৈরিতে অংশগ্রহণ করায়। এই নানা শ্রেণী পেশার মানুষের মধ্যে রয়েছে সরকারী নীতি নির্ধারক, মতমোড়ল, সাম্প্রদায়িক নেতা, আমলা, টেকনোক্র্যাট, পেশাদার দল, ধর্মীয় সমিতি, বেসরকারি সংস্থা, বেসরকারি খাত, নানা সম্প্রদায় ও ব্যক্তি। এই যোগাযোগ কৌশল কোনো পরিবর্তন তৈরিতে, সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়নকে জোর দিতে, পরিবর্তনের জন্য সক্রিয় পরিবেশ তৈরি করতে ব্যক্তি বা কমিউনিটিকে এজেন্ট হিসেবে কাজে লাগায়। কোনো প্রোজেক্ট সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পাবে কিনা সেটি নির্ধারণ করে এইসব এজেন্টরা। সাধারণত আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া সম্পাদন করা হয়। বিশেষ করে মুখোমুখি যোগাযোগ এই ক্ষেত্রে বেশ কার্যকর। 

জনসমর্থন তৈরির অন্যান্য কাজের মধ্যে রয়েছে গণমাধ্যম সচেতনতা তৈরির ক্যাম্পেইন, কোনো সমস্যা সমাধানে মতমোড়ল বা নীতিনির্ধারকদের অ্যাডভোকেসি, কোনো ইস্যু সম্পর্কে জনমত তৈরির জন্য সানাজিক সংলাপ যেমনঃ জাতীয় টেলিভিশিন ও রেডিওর টক শো, কমিউনিটি মিটিং, থিয়েটার পারফরমেন্স, লিফলেট প্রদান ইত্যাদি। মূলত এর ফলাফল তৃণ্মুলন পর্যায়ের মানুষকে কোনো সিদ্ধান্ত তৈরিতে একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরির মধ্যে নিহিত। 

জনসমর্থন তৈরির পাঁচটি ধাপ – 

জনসমর্থন তৈরির এই প্রক্রিয়া প্রমাণ করে সামাজিক ও মানবীয় আচরণ পরিবর্তনের জন্য সমাজের একাধিক স্তরের সহযোগিতা প্রয়োজন। ব্যক্তি থেকে কমিউনিটি, আইনী পদক্ষেপের পাশাপাশি সবার কাজের সমন্বয় প্রয়োজন। এই প্রক্রিয়ার মূল কৌশলই হলো যেকোনো পুঁজি তৈরি করতে অ্যাডভোকেসিকে ব্যবহার করে সামাজিক নিয়মে পরিবর্তন আনা, বিশেষ কোনো ইভেন্টে জনসচেতনতা তৈরি করা, যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য জনসমর্থন তৈরি করা, সমাজের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং অংশীদারীত্ব ও নেটওয়ার্ক তৈরি করা, সেই অবস্থাগুলোকে শক্ত করা।



Social Change Communication

সামাজিক পরিবর্তন যোগাযোগ সরকারি ও বেসরকারি সংলাপ, যুক্তিতর্ক ও আলাপ-আলোচনা করার একটি উদ্দেশ্যমূলক ও পুনরাবৃত্তিমূলক প্রক্রিয়া। এখানে ব্যক্তি বা কোনো দলীয় পর্যায় থেকে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে তাদের প্রয়োজন এবং অধিকার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে কাজ করা হয়। এই প্রক্রিয়াটি সাধারণত অংশগ্রহণমূলক। বৃহৎ পরিবেশে মানুষের আচরণ পরিবর্তন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চর্চা থেকে ক্ষতিকারক বিষয়গুলোকে বাদ দিয়ে সামাজিক শক্ত একটি পরিবর্তন আনার উদ্দেশ্যে কাজ করা হয়। 

জনসমর্থন তৈরির প্রক্রিয়াতে যখন কয়েকজন মিলে বা কয়েকটি দল মিলে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করে, সামাজিক পরিবর্তন যোগাযোগের ক্ষেত্রে তখন ব্যক্তি নিজেই রকটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজের প্রয়োজন, অধিকার, পরিবেশগত ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন আনতে কাজ করে। এই প্রক্রিয়াটিও একটি সংলাপ নির্ভর প্রক্রিয়া। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ঐতিহ্যগত মিডিয়ার এখানে যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে।
সামাজিক পরিবর্তনের জন্য সম্প্রদায় সংলাপ সাধারণত একটি প্যাটার্ন অনুসরণ করবে। সংলাপ সাধারণত পরিবর্তনের জন্য একজন ব্যক্তি অণুঘটক হিসেবে কাজ করে। অণুঘটক যদিও একজন ব্যক্তি হতে পারেন, কোনো সংস্থার এজেন্ট হতে পারেন অথবা গণমাধ্যমে প্রচারিত কোনো বার্তা হতে পারে। যেমনঃ কোনো মা যিনি হয়তো বা নিউমোনিয়া কি জানেন না, কিন্তু রোগটির স্বরূপ চেনেন, তিনি অন্যান্য মায়েদের কাছে শিশুদের এই রোগের ধরন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে পারেন। এই আলোচনার মধ্য দিয়েই একজন ব্যক্তি সমাজের কোনো পরিবর্তনের অণুঘটক হয়ে উঠতে পারেন। কোনো সমস্যাকে সামনে আনার জন্য কিছু সামনে রাখতে হতে পারে –

(১) স্পষ্টভাবে কোনো সমস্যার বর্তমান অবস্থা নির্ধারন করা এবং সমস্যা সমাধানে সমাজের মানুষের কি কি দূরদর্শিতা রয়েছে তার আলোচনায় অংশ নেয়া। যেমনঃ সব শিশুই যাতে সময়মত প্রতিষেধক পায় তা নিশ্চিত করা।
(২) নির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য উদ্দেশ্যগুলোর বিকাশ যা সমস্যাটির সমাধানের জন্য সম্প্রদায়ের প্রত্যাশাগুলো প্রতিফলিত করে। যেমনঃ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাঁচ বছরের নিচে বয়সী শিশুদের প্রতিষেধক দেয়া নিশ্চিত করা।
(৩) পরিবর্তনকে উৎসাহিত করার জন্য যথাযথ ও যুক্তিসঙ্গত ক্রিয়াকলাপ নির্ধারন করা। যেমনঃ প্রতিষেধক নেয়া নিশ্চিত করতে বিভিন্ন নাটক, পোস্টার ইত্যাদির ব্যবহার।
(৪) সমাজের বিভিন্ন মানুষকে লক্ষ্য অর্জনে কাজ বুঝিয়ে দেয়া
(৫) পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখা
(৬) কাজের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধন হচ্ছে কিনা তার ফলাফল মূল্যায়ন করা
(৭) কাজের মূল্যায়ন করতে সংলাপের চর্চা


Behavior Change Communication

BCC একটি তাত্ত্বিক নির্ভর, গবেষণা নির্ভর, মিথস্ক্রিয়ামূলক প্রক্রিয়া। যোগাযোগ মূলত ম্যাজিক বুলেটের মত কাজ করে না। কোনো লক্ষ্য অর্জনে শুধু প্রচারণা চালালেই যে লক্ষ্য অর্জিত হয়ে যাবে তেমনটি নয়। যোগাযোগ বাস্তবায়নে বেশির ভাগ সময়ই মতমোড়লের প্রয়োজন হয়, যিনি ব্যক্তি পর্যায়ের মানুষের ভেতরে পরিবর্তন আনার জন্য তাদের জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্বাসে পরিবর্তন আনার জন্য কাজ করে। মূলত, মানুষের আভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের জন্য বেশকিছু ধাপ পার হতে হয়। যেমনঃ শিশুদের প্রতিষেধক দেয়া নিশ্চিত করতে আমরা কোনো শিশুকে নিশ্চয়ই দলে ভিড়াতে পারব না। প্রতিষেধক নিশ্চিত করবে শিশুটির মা অথবা তার পরিবার। এক্ষেত্রে একটি ফলাফলে যেতে কয়েকটি ধাপ পেরোতে হয়। এই ধাপগুলো KAP নামে পরিচিত (knowledge, attitude, practice)। এগুলোকে আচরণ পরিবর্তনের ধাপ বলা হয়। 

Knowledge / জ্ঞানস্তর বাড়ানোর জন্য প্রথমেই মতমোড়লকে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান করতে হবে। মতমোড়ল মিডিয়াও হতে পারে আবার কোনো ব্যক্তিও হতে পারে। যেমনঃ শিশু জন্মের পরে পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতিষেধকগুলো কেন দিতে হয়, কয়টি প্রতিষেধক দেয়া দরকার, না দিলে কী কী ক্ষতি হতে পারে, দিলে কোন সমস্যা এড়ানো যেতে পারে, কোথায় এই স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যাবে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো জরুরী।
Attitude / দৃষ্টিভঙ্গিঃ তথ্য দেয়ার পর প্রয়োজন হয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। যে এলাকায় প্রতিষেধক সুবিধা পৌঁছায়নি স্বাভাবিকভাবেই মায়েরা তাদের সন্তানদের টীকা দেয়াতে ভয় পাবেন। দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করার জন্য সরাসরি শুধু শিশুর মাকে নয়, তার আশেপাশের মানুষদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনও জরুরী।
Practice / চর্চাঃ কোনো কিছু সম্পর্কে জেনে, দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের পরে প্রয়োজন হয় সেই পরিবর্তন চর্চার। শিশুর মা হয়তো একটি টীকা দেয়ার পরে আর শিশুকে টীকা দেয়ার জন্য নিয়ে যাচ্ছেন না, অথচ তিনি জানেন যে প্রতিষেধক না দিলে শিশুর কী কী সমস্যা হতে পারে। চর্চা না থাকলে মূলত জ্ঞানস্তর বৃদ্ধি বা দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন কোনো বিশেষ কাজে আসবে না।


BCC কৌশল ব্যবহারের কিছু উপকারিতা রয়েছে / Using BCC approach can help to:

- সমাজে কোনো বিষয়ে আলোচনা করা এবং সমস্যা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ায়
- কোনো বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান বৃদ্ধি করে যেমনঃ খাওয়ার আগে হাত ধোয়া
- মানুষের মনোভাবকে পরিবর্তন করে, যেমনঃ নিউমোনিয়া রুখতে শিশুকে টীকা দেয়ার প্রয়োজনীয়তা
- কোনো বিষয়ে লজ্জা কমানো
- তথ্য ও সেবার জন্য চাহিদা তৈরি
- কোনো সমস্যা সমাধানে নীতিনির্ধারক ও মতমোড়লদের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ যেমনঃ নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়াতে শিশু মৃত্যু হ্রাসে করণীয়
- প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য পরিসেবাগুলো প্রচার করা
- দক্ষতা ও স্ব-কার্যকারিতা (self-efficiency) বাড়ানো। যেমনঃ শিশুর ব্যবহার্য জিনিসগুলো কীভাবে জীবাণুমুক্ত রাখতে হবে সে বিষয়ে কাজ করা









Wednesday, May 20, 2020

উন্নয়নের জন্য যোগাযোগ

উন্নয়নের জন্য যোগাযোগ কি?

উন্নয়ন মূলত যোগাযোগীয় একটি প্রক্রিয়া। সামাজিক, রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক বা অবকাঠামোগত যেকোনো পরিবর্তনই হোক না কেন তা আনতে যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। মূলত communication for development (c4d) বা উন্নয়নের জন্য যোগাযোগ প্রক্রিয়াটি একটি বিশেষ ধরনের যোগাযোগ। একটি এলাকায় বিশেষ করে প্রান্তিক কোনো অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জন্য যা যা যোগাযোগ প্রয়োজন ও তাদের বাস্তবায়ন প্রয়োজন, এই প্রোগ্রামটি সেসব বিষয় মাথায় রেখেই করা হয়েছে। বছরের পর বছর নানা প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে উন্নয়নের জন্য যোগাযোগের প্রক্রিয়ার মধ্যে বিশেষ পরিবর্তন এসেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত উন্নয়ন যোগাযোগ ছিল একটি একমুখী প্রক্রিয়া। বার্তা বাহকের কাছ থেকে গ্রাহকের কাছে পৌঁছবে। যেমনঃ টেলিভিশনে বা রেডিওতে হিটলারের কোনো ভাষণ বা আদেশ জারি হলে এতে হস্তক্ষেপের ক্ষমতা বার্তা গ্রাহকের নেই। কিন্তু পরবর্তীতে আস্তে আস্তে অবস্থার পরিবর্তন আসতে শুরু করে। c4d আন্তব্যক্তিক যোগাযোগের মধ্যে একটি পরিবর্তন আনে। মুখোমুখি যোগাযোগের প্রক্রিয়া চালু করে। এ যোগাযোগ হতে পারে দু’জনের মধ্যে যোগাযোগ অথবা ছোট দলীয় কোনো যোগাযোগ। যেমনটাই হোক না কেন, শর্ত একটাই – এই যোগাযোগ সবাইকে মুখোমুখি থেকে অংশ নিতে হবে।

© অরুণমীলা

(ঊন্নয়ন যোগাযোগ প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের চেয়ে অনেকাংশে আলাদা। উন্নয়ন যোগাযোগের কাজ শুধুমাত্র তথ্য দেয়া নয় পাশাপাশি মানুষের মনস্তত্ত্ব আবেদনীয় অনুভূতির অনুরণন ঘটানো। যেমনঃ পথনাটক, কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, জনসাধারণের কথা শোনা, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতা প্রভৃতি একই সাথে সাধারণ মানুষকে তথ্য দিচ্ছে, মানুষকে তথ্য দিয়ে আবেগীয় অনুরনন ঘটাচ্ছে। আমরা যেকোনো কিছু সাধারণভাবে জানার চেয়ে সেটা যদি আবেগ দিয়ে অনুধাবন করি তাহলে বিষয়টিকে আত্মস্থ করতে পারি। উন্নয়ন যোগাযোগ আমাদেরকে প্রভাবিত করতে পারে, আমাদের আবেগীয় সত্ত্বাকে জাগিয়ে তুলতে পারে, পরিবর্তন আনতে পারে। উন্নয়ন যোগাযোগ আমাদেরকে ইন্দ্রিয় দিয়ে পারিপার্শ্বিকতাকে বুঝতে শেখায়, বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়গুলোতে পথ দেখায়।)




উন্নয়নের জন্য যোগাযোগ এর বৈশিষ্ট্যঃ


C4d মূলত এমন একটি প্রক্রিয়া যা সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক আদর্শকে এবং সাধারণ মানুষকে নিয়ে কাজ করে। সমাজের বিভিন্ন অংশ, কমিউনিটি, ছোট-বড় সবার সমস্যা চিহ্নিত করে সেইসব সমস্যার সমাধানের চেষ্টা ও সে অনুযায়ী কাজ করে। দু’ধাপে c4d প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপে যেকোনো বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা, তথ্য ও জ্ঞান দেওয়া হয়। দ্বিতীয় ধাপে সাধারণ মানুষ যোগাযোগের হাতিয়ার ও কৌশল ব্যবহার করে তাদের যাপিত জীবনের উন্নয়নের জন্য সংগৃহিত ধারনা কাজে লাগায়। শুধুমাত্র একজন বা কয়েকজন যদি এই উন্নয়নের আওতায় পড়ে তাকে আমরা c4d বলি না। সমাজের প্রত্যেকটি মানুষকে এই প্রোগ্রামের আওতায় এনে তাদের জীবন যাপনের উন্নয়ন হলেই আমরা সে উন্নয়নকে c4d এর আওতাভুক্ত করে বলতে পারি যে উন্নয়ন এসেছে



© অরুণমীলা

ইউনিসেফ c4d এর কৌশল অবলম্বন করে শিশুদের ও কমিউনিটির মধ্যে এক ধরনের সংযোগ তৈরি করেছে। তারা শিশুদের বেঁচে থাকা, তাদের উন্নয়ন, সুরক্ষা ও বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে c4d প্রক্রিয়াকে আত্মস্থ করেছে। পোলিও থেকে রক্ষা বা পোলিও হলে করনীয়, মাতৃকালীন অবস্থা, কম বয়সী বিয়ে প্রভৃতি প্রোগ্রামে অভাবনীয় কাজ করেছে ইউনিসেফ।

C4d কে আমরা কাজের আওতায় না ফেলে মূলত কৌশল হিসেবে বিবেচনা করে কিছু বৈশিষ্ট্য নির্ধারন করেছি।

  • C4d is based on dialogue / c4d মূলত সংলাপ নির্ভর প্রক্রিয়া।
  • C4d supports social change / c4d সামাজিক পরিবর্তনকে সমর্থন করে।
  • C4d is sensitive to local culture / c4d প্রান্তিক সংস্কৃতির ব্যাপারে স্পর্শকাতর।

C4d মূলত সংলাপনির্ভর প্রক্রিয়া

উন্নয়নের ধারণা ছোট করে বোঝাতে সংলাপ খুব সম্ভবত সবচেয়ে অর্থবহ শব্দ। এই যোগাযোগ প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের মত একমূখী হয়না। নির্দিষ্ট কয়েকজন দর্শক ও অনির্দিষ্ট কৌশল ও বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তে সবাইকে দর্শক-শ্রোতা করে নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য ধরে এই যোগাযোগ প্রক্রিয়া চলে। বিপরীতে, c4d যোগাযোগ প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের সাথে তাল মিলিয়ে একই সাথে চলা হয়। অর্থা সাধারণ মানুষ এখানে কথা বলার সুযোগ পাবে আবার কোনো কমিউনিটি, সরকার, স্টেকহোল্ডাররাও কথা বলার সুযোগ পাবে। দুপক্ষের মধ্যে তথ্য আদানপ্রদান হবে, মিথষ্ক্রিয়া হবে। c4d এর লক্ষ্য থাকে নির্দিষ্ট সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের মানুষকে খুঁজে বের করে তাদের সমস্যা, প্রয়োজনকে চিহ্নিত করা ও তাদের অংশগ্রহণকে উসাহিত করা।

© অরুণমীলা

অভিজ্ঞ যোগাযোগ কর্মীদের মতে, সংলাপ প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের সাথে খুব সহজে যোগাযোগ করা যায়। তাদের আচার-আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা যায়। উদাহরণস্বরূপ, কেনিয়ায় কৃষকদের নতুন কৃষিকাজের প্রক্রিয়ায় সাফল্য ছিল ধারণাতীত। সেখানে সরকার ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রচারে কৃষিকাজের নতুনভাবে চর্চা শুরু হয়। কিন্তু কেনিয়ায় এই কৃষিকাজের ফলাফল ছিল প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম। ২০১৩ সালের একটি সার্ভের ফলাফলে দেখা গেছে এই অপ্রত্যাশিত ফলাফলের কারণ তথ্যের অপ্রাচুর্যতা নয়। গ্রামের মানুষ তাদের নিজস্ব ভাষায় তথ্য পেয়েছে, লিফলেট-ম্যানুয়াল পেয়েছে, পথপ্রদর্শনা পেয়েছে। কিন্তু এই হতাশাব্যাঞ্জক ফলাফলের পেছনে কারণটা ভিন্ন ছিল। সাধারণ মানুষের সাথে এই পথপ্রদর্শকদের যোগাযোগ ছিল একমূখী। অর্থা কৃষকরা কোনো ফলাবর্তন দেয়ার সুযোগ পায়নি। তারা তাদের মত তথ্য দিয়ে গেছে। গ্রামের মাটি ও মানুষের কথা, কৃষকদের অভিজ্ঞতা, তাদের প্রয়োজন-অপ্রয়োজনের কথা কেউ শোনেনি। নতুন প্রক্রিয়ায় কৃষিকাজ করতে জিজ্ঞাসা, প্রয়োজন, সমস্যা কোনো কিছুই প্রতিষ্ঠানগুলো জানতে চায়নি। কৃষকদের মনেও ক্ষোভ ছিল যে, সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেহেতু তাদের কথা শুনছেন না, তাদেরও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা শোনার প্রয়োজন নেই।

সত্যি বলতে, সংলাপ – পারস্পারিক মিথস্ক্রিয়া ছাড়া তথ্য দেয়া অনেকটা তেলবিহীন গিয়ারবক্সের মত। সংলাপ তথ্যের মূল কথা। সাধারণ মানুষ নতুন তথ্য, নতুন চিন্তাভাবনার সাথে নিজেদেরকে মেশাতে চায়। কিন্তু নিজেরা যদি সে বিষয়ে মতামত দিতে না পারে কোনো প্রক্রিয়া বা কোনো নতুন তথ্য তারা আত্তীকরণ করতে পারেনা। সব বিষয়ে সাধারণ মানুষের মতামত রয়েছে, প্রশ্ন করার প্রয়োজন রয়েছে। উন্নয়ন প্রক্রিয়ার কোন বিষয়ে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে তাদের মতামত প্রকাশের জায়গা করে দিতে হবে। c4d এর প্রাথমিক কাজই হল তথ্য আদান-প্রদানের জন্য জায়গা তৈরি করে দেওয়া যাতে সাধারণ মানুষ নিজেরাই নিজেদেরকে এই যোগাযোগ প্রক্রিয়ার এজেন্ট করে তুলতে পারে।


C4d সামাজিক পরিবর্তনকে সমর্থন করে

C4d প্রক্রিয়ায় কোনো যোগাযোগকর্মীর দৃশ্যমানতা বাড়িয়ে তুলতে পারে। কিন্তু এটা তার প্রাথমিক লক্ষ্য নয়। c4d সবসময় সামাজিক পরিবর্তন আনতে উন্নয়নকে প্রচার করে। যোগাযোগের হাতিয়ার (communication tools) যোগাযোগ শুরু করার একটি উপায় মাত্র, কিন্তু এখানেই যোগাযোগ শেষ হয়ে যায় না। এটি শুধুমাত্র একটি যোগাযোগীয় প্রক্রিয়া, কোনো নির্দিষ্ট ফলাফল (output) নয়। তবে যোগাযোগের এই প্রক্রিয়াটি সমাজের পরিবর্তন আনে। সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রচার চালায়। কোনো প্রোজেক্টের মালিকানার ধারণাকে শক্ত করে। উন্নয়ন সময়সাপেক্ষ। যেখানে উন্নয়ন সাধিত হয় সেটি শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলাফল নয়। প্রগাঢ় সামাজিক ও যোগাযোগীয় প্রক্রিয়ারও ফলাফল। যেমনঃ কোনো এলাকায় কলেরা রোধে শুধুমাত্র পরিষ্কার জীবাণুমুক্ত পানির ব্যবস্থা করাই যথেষ্ট নয়। কলেরা রোধে সাধারণ মানুষের সচেতনতাও প্রয়োজন। যোগাযোগ কর্মীদেরকে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ তৈরি করতে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সংলাপ বাড়াতে হবে এবং সংলাপ প্রক্রিয়াটি কাজে লাগছে কিনা সে বিষয়টিও নিশ্চিত হতে হবে। সমাজে পরিবর্তন আনতে সামাজিক পরিবর্তনকে সাধারণ মানুষ সমর্থন করছে কিনা সে বিষয়টি মাথায় রাখা অত্যন্ত জরুরী।

© অরুণমীলা

C4d কোনো নির্দিষ্ট কৌশল নয়। এটি যোগাযোগ ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সেতুবন্ধন। c4d কোনো প্রকল্পে সামাজিক এবং রাজনৈতিক সমতা রাখে। এজন্যই কারিগরি বিশেষজ্ঞ এবং যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মধ্যে একটি নিখুঁত সহযোগ থাকতে হয়।


C4d প্রান্তিক সংস্কৃতির বিষয়ে স্পর্শকাতর

উঁচুতলার কোনো দালানে বসে c4d প্রক্রিয়ার চর্চা করা যায় না। এই উন্নয়ন অবশ্যই প্রান্তিক সূত্র ও সংস্থান (context and resources) এর উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে। উন্নয়নের প্রভাব বাড়াতে অথবা নিশ্চিত করতে প্রান্তিক মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, আচার-ব্যবহার, রীতি-নীতির সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে। যেমনঃ পরিবারে নির্যাতনের কথা ধরা যাক। ঘরে ঘরে নির্যাতনের ব্যাপারে কী করতে হবে, কীভাবে শক্ত প্রভাব ফেলা যাবে সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে আগে বুঝতে হবে কোথায় কাজ করা হচ্ছে। বলিভিয়া, বাংলাদেশ বা বুরকিনি ফাসোতে আলাদা আলাদা সংস্কৃতি। তাদেরকে শারীরিক নির্যাতনের বিরোধিতা করতে আলাদা আলাদাভাবে বার্তা দিতে হবে। ‘কীভাবে’ প্রশ্নটি এখানে প্রয়োজনীয়। প্রতিটি দেশের সংস্কৃতি, কোনো তথ্য নেয়ার ধরণ, রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা আলাদা। আবার প্রতি দেশের মধ্যে আলাদা আলাদা শহরের আচার-ব্যবহার-রীতি-নীতিও আলাদা হয়। নারী-পুরুষ, শহর-গ্রাম, অজপাড়াগা-মফস্বল ভেদে মানুষের সংস্কৃতি আলাদা হতে পারে।

© অরুণমীলা

এসব ক্ষেত্রে কীভাবে আমরা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছতে পারি উন্নয়নের বার্তা নিয়ে। c4d এর কাজের মধ্যে যেকোনো এলাকার মানুষের সংস্কৃতি, ব্যবহার, আচার, রীতি-নীতি, সনাক্তকরণ পরিচয়, দেব-দেবতাকে কাজে লাগিয়ে এদের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা যেতে পারে। তাদেরকে বোঝানো যেতে পারে যে তাদের চর্চিত সংস্কৃতির বিরোধিতা করে নয়, সেসবকে কাজে লাগিয়েই, সেসবের প্রতি সম্মান রেখে, সম্মান মূল্যবোধ জিইয়ে রেখে উন্নয়ন প্রক্রিয়ার চর্চা হচ্ছে। আমরা যদি সাধারণ মানুষের চর্চিত সংস্কৃতি ও নতুন সংস্কৃতির মধ্যে সাদৃশ্য সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারি তবে আমরা সেসব মানুষের মধ্যে উন্নয়নের প্রতি বিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে পারবো। যেমনঃ পুতুলনাচ বাংলাদেশের কিছু এলাকায় ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান। পুতুলনাচের মাধ্যমে আমরা সাধারণ মানুষকে এইডস বিষয়ে সচেতন করে তুলতে পারি।


উন্নয়নের জন্য যোগাযোগ প্রয়োজন কেন?

© অরুণমীলা

C4d কেন এর একটি সহজ উত্তর হতে পারে যাদের জন্য c4d তাদের প্রভাবিত করা। জনগণের মাঝে সচেতনতা তৈরি করা। কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্যে ঐ ব্যক্তিদের প্রণোদিত করা।

সম্পূর্ণ বিষয়টি সচল রাখা এবং সাধারণ মানুষদের প্রোজেক্টটির নানাদিক ভালোভাবে জানাতে থাকা। আর এই প্রক্রিয়া এমন হবে যাতে মানুষজন বিনোদিত হতে পারে। এতটুকুতে বসে থাকলে c4d সম্পূর্ণ হবে না। ক্ষমতায়নের বিষয়টি সুনিশ্চিত করতে হবে। সমস্ত বিষয়ের পরিচয় দিতে হবে যাতে কোনো বিষয় অজানা না থাকে। যেকোনো সমস্যা বা বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিতর্কের সুযোগ করে দিতে হবে যাতে সঠিক বিষয়টি বেরিয়ে আসে। এই কাজগুলোর মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঞ্চলে পরিবর্তন আনতে হবে। এই বিষয়টি যাতে প্রচার করা যায় এবং অন্যদের প্রভাবিত করা যায় সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।


উন্নয়নের জন্য যোগাযোগের চারটি প্রধান কাজঃ

  1. Facilitating access to information and knowledge / তথ্য ও জ্ঞানের প্রতি অধিগমনের সুবিধা প্রদান
  2. Promoting participation / অংশগ্রহণের প্রচার
  3. Giving a voice to exclude
  4. Influencing public policies / জনসাধারণের নীতি প্রভাবিত করা


Facilitating access to information and knowledge / তথ্য ও জ্ঞানের প্রতি অধিগমনের সুবিধা প্রদান

কোনো বিষয় সম্পর্কে যেসব মানুষের মধ্যে জ্ঞান বা তথ্যের কোনো যোগসূত্র নেই অথবা থাকলেও তার মাত্রা খুব কম সেক্ষেত্রে সেসব মানুষ সাধারণত সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেকে পিছিয়ে থাকে। যোগাযোগ পদ্ধতি ও মিডিয়ার সাথে মানুষের যোগসূত্র স্থাপনের মাধ্যমে c4d উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অন্যতম গুতুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা পালন করে। অনেকভাবেই পিছিয়ে পড়া মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দেয়া যায়। এক্ষেত্রে কার্য সমাধায় সাঁজোয়া বিস্তৃত একটি পরিসর রয়েছে। যেমনঃ কমিউনিটি রেডিও, শিক্ষামূলক থিয়েটার পারফরমেন্স, জনপরিসর, সর্বজনীন ইভেন্টে অথবা ইন্টারনেট ভিত্তিক শিক্ষামূলক প্রচারণাগুলোতে খুব সহজেই জনসাধারণের কাছে বার্তা পৌঁছে দেয়া সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে যোগাযোগের এই প্রক্রিয়াটিকে অবশ্যই হতে হবে সর্বব্যাপী এবং অবারিত। আমরা যদি চাই যেকেউ পিছিয়ে না পড়ুক, তবে যোগাযোগ কর্মীদের শেষ পর্যন্ত কাজ করে যেতে হবে।

© অরুণমীলা

যেমনঃ সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল সঠিকভাবে একদিকে তথ্যের অভিগমন (access) নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে সামাজিক ও মানবীয় উন্নয়নের দিকে জোর দিয়ে কাজ করেছে। পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি মানুষের কাছে যোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তির কোনো যোগসূত্র নেই। যোগাযোগের এই শূন্যস্থানটি পিছিয়ে পড়া মানুষের অবস্থানকে আরো খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যোগাযোগ কর্মীদের কাজই হলো এইসব প্রান্তিক মানুষদের প্রয়োজনীয় যোগাযোগ সরঞ্জাম দিয়ে এই বিরাট শূন্যস্থানটিকে পূরণ করা। যেমনঃ বেনিনে মেয়ে শিশুদের শিক্ষার জন্য পুতুল উসব, মালিতে মোবাইল স্কুলের সহায়তার জন্য সামাজিক আন্দোলন, নিকারাগুয়াতে বিশুদ্ধ পানি ব্যবহারের জন্য ‘ওয়াটার সার্কাস’ এই অধিগমনের ভালো উদাহরণ হতে পারে। c4d এর কাজই হলো তথ্য ও জ্ঞানের সমন্বয় ও প্রান্তিক মানুষ যাতে এই সমন্বয় দ্বারা উপকৃত হতে পারে তা নিশ্চিত করা। মানুষের অনেক পরিবর্তনই নির্ভর করে প্রয়োজনীয় তথ্য থাকা না থাকার উপরে। তবে এই তথ্য দেয়া যাতে কার্যকর হয় সে বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। অক্ষরজ্ঞানহীন কৃষককে এসএমএস এর মাধ্যমে সারের উঠতি দাম জানানো মোটেই যোগাযোগের কার্যকর কোনো উপায় নয়। c4d এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করবে।


Promoting Participation / অংশগ্রহণকে উসাহিত করা

মানুষের মৌলিক চাহিদাকে প্রভাবিত করতে পারবে এরকম কোনো বিষয়ে মতামত দেয়া প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার। এটি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলোরও একটি প্রয়োজনীয় দৃষ্টিভঙ্গি হতে হবে। যেসব প্রোজেক্টগুলোতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ রয়েছে সেইসব প্রোজেক্টগুলো সাধারণত অনেক বেশি স্থায়ী ও টেকসই হয়ে থাকে। c4d প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান একটি কাজ হলো সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করা। C4d এর দায়িত্ব নাগরিক এবং স্থানীয়, ধর্মীয় জাতীয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে যোগাযোগীয় সংলাপের জায়গা তৈরি করে দেয়। উন্নয়ন যোগাযোগ মানুষের পরিবর্তন চর্চা করতে উসাহিত করে। এজন্য অংশগ্রহণ জরুরী।

© অরুণমীলা

জনগণ যাতে যেকোনো তথ্য গ্রহণে উসাহিত হয় c4d সেই লক্ষ্যে কাজ করে। পাশাপাশি অংশগ্রহণকে উসাহিত করার জন্য বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষকে সাহিত করার জন্য নতুন নতুন প্রক্রিয়া c4d উপস্থাপন করে। যেমনঃ বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়ায় ফান্ড ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনঃর্গঠন ব্যবস্থাপনা। এক্ষেত্রে প্রকাশ্য শুনানী ও বিতর্ক, রেডিও ফোরাম ও অনলাইনে তথ্য অংশগ্রহণের প্লাটফর্ম হিসেবে ধরা যায়। পাবলিক শুনানীতে নেপালে বিনিয়োগ কোথায় করা হবে তা নির্ধারিত হয়েছিল। ভ্রাম্যমাণ থিয়েটার বুরকিনা ফামোতে সাধারণ নির্বাচনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছিল। কিউবাতে সাধারণ মানুষের পরামর্শ নিয়ে নগরায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ইউক্রেনে মাল্টিমিডিয়া ক্যাম্পেইন রাজনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছিল।

  • Meena – Education through entertainment
  • নানা-নাতী
  • স্বর্ণকিশোরী


Giving a voice to exclude/ মতামত দেয়ার ক্ষেত্র তৈরি করে

উন্নয়নশীল দেশগুলোর মিডিয়া প্রায়ই রাজনৈতিক অভিজাতদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত করে। যদিওবা পৃথিবীর জনসংখ্যার একটি বড় অংশ দরিদ্র মানুষ, যুবক-যুবতী এবং নারীদের নিয়ে কিন্তু যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে বা জাতীয় বিষয়ে এই কম সুবিধাপ্রাপ্ত সামাজিক গোষ্ঠীর মতামত। উদ্বেগ বা আকাঙ্ক্ষাকে বাদ দেয়া হয়। c4d এই গোষ্ঠীগুলোকে তাদের মতামত প্রকাশ করতে উসাহিত করে।

© অরুণমীলা

নিউজলেটার মুদ্রণ করা, নতুন যোগাযোগ চ্যানেল খোলা, নিজের মত প্রকাশে মিডিয়ার ব্যবহার করতে শেখায় c4d। এর মাধ্যমে দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক মানুষ ও শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। c4d’র অন্যতম একটি উদ্দেশ্যই হলো ঈই পিছিয়ে পড়া মানুষদের একটি আওয়াজ তৈরিতে সাহায্য করা। কেউ যেন বাদ না পড়ে। সবাইকে যেকোনো বিষয়ে একত্রিত করা। তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে কেউ যাতে পিছিয়ে না পড়ে তা নিশ্চিত করা। যদিও বা কেউ পিছিয়ে পড়ে তাদেরকে মূলধারায় সংশ্লিষ্ট করা।


Influencing public policies / জনসাধারণের নীতি প্রভাবিত করা

© অরুণমীলা 

C4d কোনো পরিবেশগত, সামাজিক বা রাজনৈতিক বিষয় যদি উন্নয়নে বাঁধা তৈরি করে যে বিষয়গুলোকে তুলে ধরে। কিন্তু শুধু সমস্যাগুলোকে তুলে ধরাই c4d এর মূল কাজ নয়। এর চূড়ান্ত লক্ষ্য জনসাধারণের নীতিমালা যেগুলো পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা প্রয়োজন সেগুলোকে প্রভাবিত করা। মানুষের দাবীকে জোরদার করা। নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করা। যেমনঃ যৌতুক বিরোধী আইন পাসে প্রভাবন, নদীবর্ধন আইন পাশে কথা বলা ইত্যাদি।

এক্ষেত্রে জর্জিয়ার SDC’র উদাহরণটি প্রাসঙ্গিক। সেখানে ভেষজ চাষের ভয়াবহ পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি তথ্যচিত্র এমন এক বিতর্কের সূচনা করেছিল যার ফলাফলে সরকারকে বেশকিছু সংশোধনমূলক ও সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল।





(লিখেছেন - অরুণমীলা 

এটি অ্যাকাডেমিক কাজের অংশ হিসেবে ক্লাস লেকচার ও ম্যানুয়াল অনুসারে লিখা হয়েছে।)


আরও পড়ুন - 

যোগাযোগের সরঞ্জাম/হাতিয়ারসমূহ 

উন্নয়নের জন্য যোগাযোগের কৌশল (Approaches of C4D)

 

   


Featured Post

ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের প্রয়োজনীয়তা

- সমাজে প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণমাধ্যমের কাজ হলো সমাজের অপরাপর শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, বিশেষত রাষ্ট্র ও সরকারের কাজের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখা এবং জন...