ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের মূল লক্ষ্য হলো পাঠককে কোনো বিষয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ প্রদান করা। পাঠকরা প্রতিদিন যে অপরিমেয় তথ্য লাভ করেন তার মধ্য থেকে যেসব তথ্য মানুষের জন্য তাৎপর্যবহ তাকে বোধগম্য ও সহজবোধ্যভাবে উপস্থাপন করাই ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের কাজ। কোনো তথ্য কেন এবং কীভাবে পাঠকের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করছে বা কীভাবে তা পাঠকের জন্য গুরুত্ববহ হয়ে উঠবে তা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন।
মানুষের কৌতুহল দিন দিন বাড়ছে। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রেই বর্তমানের সংবাদপত্র পাঠক শুধুমাত্র প্রচলিত ও সাদামাটা সংবাদ পড়ে সন্তুষ্ট হতে পারেন না। তারা বিশ্লেষণ চান। সংবাদের গভীরে যেতে চান। তাই সংবাদের পেছনে যে সংবাদ থাকে (news behind the news) সেটাও পাঠক জানতে চান। এ কারনেই সাংবাদিকতা জগতে আবির্ভাব হয়েছে ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের।
সাংবাদিকতায় সাধারণত ২ ধরনের প্রতিবেদন দেখা যায়।
উপরিতলের প্রতিবেদনকে কেউ কেউ সাদামাটা সংবাদ (straight jacket) বলে। এগুলো হল দিনের সাধারণ সংবাদ যাতে কোনো ঘটনার উপরের দিকটাই প্রকাশিত হয়। এ ধরনের প্রতিবেদনে পাঠকের মনে ঘটনা সম্পর্কে আরও যে প্রশ্নগুলো জাগ্রত হয় তার উত্তর পাওয়া যায় না। এজন্য পাঠক গভীরতর প্রতিবেদন পাঠে আগ্রহী হন। গভীরতর প্রতিবেদনকে আবার ২ ভাগে আলোচনা করা যেতে পারে।
ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন কী?
একটি ঘটনা ঘটার সময় কোনো রিপোর্টার নিজে যা দেখেছেন অথবা না দেখে থাকলেও বিশ্বস্ত সূত্র থেকে যে তথ্য পেয়েছেন সেসব তথ্য নিয়ে আপাতদৃষ্টিতে বস্তুনিষ্ঠ ও সত্যাশ্রয়ী একটি রিপোর্ট লিখতে পারেন। এভাবেই বেশিরভাগ রিপোর্ট করা হয়ে থাকে। এ ধরনের রিপোর্টকে বলা হয় সারফেস নিউজ বা উপরিতল সংবাদ।
ধরা যাক, ঝিনাইদহের একটি গ্রামে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে তার ছাত্রীকে হেনস্থা করার অভিযোগ উঠেছে। মেয়েটির বাবা-মা অভিযোগ করেছেন যে স্কুলে প্রধান শিক্ষক জরুরী এক কাজে তার ছাত্রীকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। সেখানে মেয়েটিকে নানারকম অশালীন ও অনৈতিক কথা বলে এবং পাশাপাশি মেয়েটির সাথে অসদাচরণ করেন। এবং পরবর্তীতে এ বিষয়ে সালিশ বসলে স্কুলের সেই প্রধান শিক্ষকের সাথে নবম শ্রেণীতে পড়া মেয়েটির বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়। উল্লেখ্য, সালিশে ইউনিয়ন পরিষদের হর্তাকর্তাসহ ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত ছিলেন।
এসব যা কিছু রিপোর্টটিতে দেয়া হয়েছে তা কেবল এক দিনের ঘটনা এবং যা ঘটেছে তা সরাসরি দেখা গেছে আর সে অনুযায়ী রিপোর্টটি সাজানো হয়েছে। এ ঘটনার কিছু অগ্রপশ্চাৎ থাকতে পারে যা পাঠকের জানা প্রয়োজন। তাই এই একই ঘটনা নিয়ে অন্যরকম একটি প্রতিবেদন করা যায়। যেমনঃ মেয়েটি প্রধান শিক্ষকের গিয়েছিলেন, ঠিক কি প্রয়োজনে গিয়েছিলেন? প্রধান শিক্ষক কী আগে কোনো অসদাচরণ করেছিলেন? প্রধান শিক্ষকের সাথে মেয়েটির যে বিয়ে দেয়া হলো, তার কি আগে কোনো বিয়ে ছিল? থাকলে প্রথম স্ত্রীর কাছ থেকে কী অনুমতি নেয়া হয়েছিল? আবার, অভিযোগ যার উপরে আনা হয়েছে মূলত সে অপরাধী। গ্রামের সালিশের মধ্যে চেয়ারম্যান, মেম্বার, ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। তাদের উপস্থিতিতে এবং সিদ্ধান্তে অপরাধীর সাথে মেয়েটির যে বিয়ে দেয়া হলো সেটি কি ঠিক হয়েছে? এখানে সংশ্লিষ্টরা কেন চুপ করে ছিলেন? প্রধান শিক্ষক বয়সী একজন মানুষের সাথে তের-চৌদ্দ বছর বয়সী একটি মেয়েকে বিয়ে দেয়া হলো সেটি কী নৈতিক? বা ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে আঠারো বছরের নিচে মেয়েকে বিয়ে দেয়া হয়েছে তা কী আইনের লঙ্ঘন হয়নি?
যেসব প্রশ্ন তোলা হলো সেগুলোর উত্তর যদি প্রথম রিপোর্টটির সাথে জুড়ে দেয়া যায়, তাছাড়া এরকম ঘটনায় এলাকার মানুষ কী ভাবছেন, একরম ঘটনা আগেও ঘটেছে কিনা, আইনের বিরোধী এই কাজটিকে বিশেষজ্ঞরা কীভাবে মূল্যায়ন করছেন অথবা আসলে বিয়ে দেয়া ছাড়া আর কী উপায়ে ঘটনাটি সামলে নেয়া যেতো ইত্যাদি বলা হলে সমস্ত ঘটনার একটি পূর্ণ চিত্র পাওয়া যেত, ঘটনার প্রেক্ষিত থাকত, আর সাদা চোখে যা ধরা পড়ছে না এমন সব কার্যকারণের যোগাযোগগুলোও প্রকাশ পেতো। ঝিনাইদহের মানুষ শুধু প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণের চেয়ে বেশী কিছু জানতো।
উপরের ঘটনা থেকে দেখা যাচ্ছে, ঐ ধরনের রিপোর্ট আপাতদৃষ্টিতে নয় এমন সব তথ্য বের করে আনে, একটি ঘটনাকে তার পূর্ণ প্রেক্ষিতে স্থাপন করে এবং সেই ঘটনার সাথে সম্পর্কযুক্ত তথ্য পরিবেশন করে পাঠকের জিজ্ঞাসা মেটায়। তার চেয়েও বড় কথা এই যে, খবরটির মর্ম উপলব্ধি করা যায় এধরনের রিপোর্ট থেকে। এধরনের রিপোর্টকে ইন-ডেপথ রিপোর্ট বলা হয়। এধরনের রিপোর্টের মধ্যে কিছু থাকে অনুসন্ধানী আবার কিছু থাকে ব্যাখ্যামূলক।
মার্কিন কলামিস্ট রস্কো ড্রামন্ড ব্যাখ্যামূলক রিপোর্টের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে –
“Setting today’s event against yesterday’s background to give tomorrow’s meaning.”
অর্থাৎ আজকের ঘটনাকে গতকালের প্রেক্ষিতে উপস্থাপন, যাতে আগামীকাল এই ঘটনার ফলাফল কী দাঁড়াবে তা বোঝা যায়। তবে বেশিরভাগ সাংবাদিক এই সূত্রটি বড় বেশী সরল ও কার্যত যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন। নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার রবিবাসরীয় সম্পাদক লেস্টার মার্কেল বলেছেন, ব্যাখ্যা করা এইজন্য যাতে একটি খবরের গূঢ় অর্থটি পরিস্ফুটিত হয়। এ হলো সংক্ষেপে পটভূমি, ঘটনাক্রম ও সর্বোপরি মর্মার্থ বা গুরুত্বসমূহের সমন্বয়।
একজন সম্পাদক বলেছেন, মূল ঘটনা, তার পরিবেশ ও তার চতুর্দিকের পরিস্থিতি, ঘটনাস্থলের বর্ণ ও গন্ধ, ঘটনার সাথে জড়িত ব্যক্তির পরিচয়, চরিত্র ও উদ্দেশ্য, বৃহত্তর ঘটনাপ্রবাহে ঐ ঘটনার গুরুত্ব – এ সবকিছুর সমন্বয় ঘটবে যে রিপোর্টে সেটাই হবে সবচেয়ে ভালো ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন।
আরেকজন সাংবাদিকের ভাষায়, একটি রিপোর্টে কে, কী, কখন, কোথায়, কীভাবে, কেন – সব বলার পরেও পাঠকের একটি জিজ্ঞাসা থেকে যায়, যথা – সবকিছুর ফল কী হলো বা বিষয়টি কী দাঁড়ালো? তার মতে, পাঠকের প্রশ্নটির জবাব দিতে হবে সাংবাদিককে, আর সেজন্যই প্রয়োজন ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের।
বিশিষ্ট সাংবাদিক আতাউস সামাদ বলেছেন,
‘এই ধরনের রিপোর্টের আসল উদ্দেশ্য হলো একটি ঘটনার অন্তর্নিহিত ও অব্যক্ত অর্থ প্রকাশ করা, একটি পরিস্থিতির অপ্রকাশিত দিকগুলো তুলে ধরে সামগ্রিকভাবে একটি ছবি আঁকা। ভবিষ্যতের কোনো ইঙ্গিত থাকলে তা উল্লেখ করা। পাঠকের সাথে যদি এইসব ঘটনার কোনো সম্পর্ক থাকে তা তার কাছে তুলে ধরা এবং এইসব মিলিয়ে প্রতিবেদনটি তার কাছে অর্থপূর্ণ ও মনোগ্রাহী করে তোলা।’
(লিখেছেন - অরুণমীলা)
No comments:
Post a Comment