ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন রচনার বিশেষ কোনো নির্দিষ্ট কাঠামো নেই। রিপোর্টার তার নিজস্ব ইচ্ছা ও সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী কাঠামো তৈরি করে নেন। তবে ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের তিনটি প্রধান উপাদান রয়েছে –
(১) সংবাদ নেপথ্য বা পটভূমি বা প্রেক্ষিত (Background)
(২) মানবিকীকরণ (Humanization)
(৩) ব্যাখ্যা (Interpretation)
পটভূমিঃ
ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের পটভূমি হবে এরকম যার মধ্য দিয়ে বর্তমানকে ভবিষ্যতের দিকে টেনে নেওয়া যায়। ঘটনাপ্রবাহের প্রক্রিয়ায় অতীতের কোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানকে মূল্যায়ন করে ভবিষ্যত উন্মোচন করাই এর বৈশিষ্ট্য। সংবাদের নেপথ্যকে তুলে ধরতে না পারলে বর্তমান পরিস্থিতিকে অনেক সময় বোঝা যায় না।
অধিকাংশ সাংবাদিকের কাছে পটভূমির অর্থ হলো উপরিতলের সংবাদের সঙ্গে তথ্য সংযোজন করা। মাঝে মাঝে এটি ইতিহাস যা প্রাচীন বা আধুনিক উভয়ই হতে পারে। আর তা পাঠককে একটি আবহ দেয়।
সাধারণত এখানে কোনো ঘটনার ঐতিহাসিক পটভূমি তুলে ধরা হয় যার মধ্যদিয়ে পাঠক বুঝতে পারে কেন এই ঘটনা ঘটেছে। যেখানে ঐতিহাসিক পটভূমি উপস্থাপনের সুযোগ নেই সেখানে লাইব্রেরী বা দলিল দস্তাবেজের স্তুপ থেকে প্রয়োজনীয় অংশগুলো খুঁজে বের করতে হয়।
যেমনঃ সরকার থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বাড়িভাড়া থেকে বাড়ির মালিকরা যে আয় করেন তার উপর নিয়মিত আয়কর ধার্য করা হয়েছে। বাড়ির মালিকের অন্য কোনো আয় ও বাড়িভাড়ার যে আয় সে দুটি যোগ করে মোট অংকের উপর কর ধার্য করা হবে। এ প্রতিবেদনের পটভূমি লিখতে গেলে অনেক কিছুই নিয়ে আসা যেতে পারে। যেমনঃ সরকারের এরকম সিদ্ধান্ত কী এই প্রথমবার নেওয়া হয়েছে নাকি আগেও নেওয়া হয়েছিল? প্রতিবছর বাড়িভাড়া বাড়ানোর অনুপাত কত? বাড়িভাড়া বাড়ানোর সাথে সাথে অন্যান্য আনুষঙ্গিক জিনিসের দাম বাড়ছে কিনা? বাড়ির মালিকের ইতোমধ্যেই নানা রকমের কর বা খাজনা দিচ্ছেন। সেসবের পরিমাণ কতটুকু? পাশাপাশি কর বৃদ্ধির ঘটনা আগেও ঘটে থাকলে তা আগে কেন বাস্তবায়িত হয়নি? কবে কোন প্রেক্ষিতে কর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল সেসব জানানো যেমন জরুরী তেমনি দেশের বাড়ি ভাড়া দেয় এমন মালিকের সংখ্যা কত। বাড়ি ভাড়া দেয়ার বিষয়টি গত কয়েক বছরে কি পরিমাণ বেড়েছে সেই সব তথ্য পটভূমিতে আনতে হবে।
মানবিকীকরণঃ
ব্যাখ্যামূলক রিপোর্টিংয়ের মানবিকীকরণ হচ্ছে এমন একটি শব্দ যার অর্থ হলো সংবাদগল্পকে পাঠকের পরিবেশের মধ্যে নিয়ে আসা। এর অর্থ এই নয় যে, সংবাদ গল্পটি পাঠককে উদ্দেশ্য করে লেখা। বরং তা সংবাদ গল্পটিকে এমনভাবে তৈরি করা যা পাঠকের কাছে কিছু একটা অর্থ তৈরি করে। বিষয়টির সাথে পাঠকের নৈকট্যের সম্পর্ক স্থাপন করে। যেমনঃ বাড়িভাড়ার মোট আয়ের উপর কর বসানোর ব্যাপারটিতে কারা বিপদে পড়ছেন তারা এই সংবাদটিতে আগ্রহী হয়ে উঠবেন। সেই সাথে ভাড়াটেরাও বিষয়টি সম্পর্কে আরো জানতে চাইবেন। কারণ, বাড়ির মালিকপক্ষ কর দিলে অবশ্যই বাড়িভাড়া বাড়ানোর একটি সম্পর্ক থাকে।
ব্যাখ্যাঃ
ব্যাখ্যা হলো একটি বিষয়ে সর্বোৎকৃষ্ট সংজ্ঞাদান। ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের ব্যাখ্যা অবশ্য কয়েকটি বিষয়ের উপস্থাপন। যেমন – পাঠকের মতামত, বিশেষজ্ঞদের মতামত, ঘটনার আরো বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যতের পূর্বাভাসের সমন্বয়ে কোনো ঘটনার ব্যাখ্যা দান।
ঘটনার গুরুত্ব কতটুকু, ঘটনার প্রকৃতি, কীভাবে ঘটনাটি ঘটলো তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়া হয় এই অংশে। যেমনঃ বাড়ি ভাড়ার উপর কর আরোপের ঘটনায় হার্ড নিউজ ও পটভূমি উল্লেখের পর ঘটনার প্রকৃতি বোঝাতে বাড়ির মালিকের, আয়কর বিভাগের কোনো কর্মকর্তার ও ভাড়াটিয়ার মতামত উপস্থাপন করা যেতে পারে।
পাশাপাশি দূরদর্শীতার পরিচয় এখানে মিলবে। যেমন – বাড়িভাড়া সংক্রান্ত নীতির একটি বিশেষ দিক হলো বাড়ির মালিকের যদি কোনো আয় থাকে তাহলে ভাড়ার সাথে সেই আয় যোগ করে তার উপর আয়কর ধার্য করা। যেহেতু বেশী আয়ের উপর করের আনুপাতিক হার বেশী। তাই অনেক বাড়িওয়ালা ভয় পাচ্ছেন প্রাপ্ত পুরো ভাড়াটিই কর হিসেবে চলে যাবে।
এখানে বিশেষজ্ঞদের মতামত দেয়া যেতে পারে। যেমন – একজন আয়কর আইন বিশেষজ্ঞ এ বিষয়ে বলেন, সরকারী নীতিটি ভুল, কারণ –
(১) একটি আয়ের উৎসের উপর একাধিক কর আরোপ করা হচ্ছে।
(২) অনেকে নিজে থাকার জন্য একটি সাধারণ বাড়ি তৈরি করে তার অংশবিশেষ ভাড়া দিয়ে বাড়ি তৈরির খরচ শোধ করছিলেন। তাদের এবং সত্যিকার ধনীদের মধ্যে নীতিগত পার্থক্য করা হচ্ছেনা।
(৩) বছর বছর সম্পত্তি কর ধার্্য করা হলে অনেকে বাড়ি রাখতে পারবেন না। সেক্ষেত্রে বাড়ির মালিক হতে পারবে যেকোনো কোম্পানি, কারণ তারা বাসাভাড়াটাকে কোম্পানির সম্পদ হিসেবে দেখিয়ে সম্পত্তি কর থেকে অব্যাহতি পাবেন।
আবার এখানে ভবিষ্যতের পূর্বাভাসও দেয়া যেতে পারে। যেমন – এ অবস্থায় বাসাভাড়া থেকে কর আদায়ের কী পথ করা যায় এ বিষয়ে আরও কিছু বাড়ি মালিক ও আয়কর কৌসুলিদের মতামত নিলে তারা অনেকেই বলেন যে,
(১) সবদিক হিসাব করে বাড়ির উপর একটিমাত্র কর ধার্য করুন
(২) বাড়ি থেকে আয়কে অন্য আয়ের সাথে সংযুক্ত না করে এ কর হিসাব করা হোক।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের একটি কাঠামো পাওয়া যায় –
(১) রিপোর্টটি বিচার-বিবেচনা করে মতের ওপর নির্ভর করে প্রস্তুত
(২) প্রমাণভিত্তিক তথ্য দেয়া হয়েছে
(৩) ভাড়াটেদের অতীত তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা বলে ভবিষ্যত কি হতে পারে তার আভাস দেয়া হয়েছে
(৪) সরকার যেমন নীতির কথা বলেছে তেমনি কর ধার্য ও করদান নীতির অনুল্লিখিত দিকও তুলে ধরা হয়েছে
(৫) সমাধানের কথা বলা হয়েছে
(৬) সর্বোপরি যে পরিণতি আশঙ্কা করা হয়েছিল তা অবধারিত, তা স্পষ্ট বলা হয়েছে।
অর্থাৎ, ঘটনার পটভূমি, ঘটনার অপ্রকাশিত দিক, ভবিষ্যতের ইঙ্গিত, পাঠকের সাথে সম্পর্ক, পাঠকের কাছে অর্থপূর্ণ ও মনোগ্রাহী করে তোলার চেষ্টা সবকিছুই রাখা হয়েছে। আর এ গুলোকেই বলা হচ্ছে ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের কাঠামো।
আরও পড়ুন -
No comments:
Post a Comment